ঢাকা

স্টারলিংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামছে ইউরোপ, তৈরি হচ্ছে নতুন ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইন্টারনেট–সেবায় নিজস্ব উপগ্রহভিত্তিক ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরও এক ধাপ এগিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এর অংশ হিসেবে ‘আইরিস-২’ নামে পরিচিত স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের বহর সম্প্রসারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেছে ইউরোপীয় কমিশন। নতুন চুক্তির আওতায় এই নেটওয়ার্কে আরও ৬৬টি কৃত্রিম উপগ্রহ যুক্ত হবে। ফলে আইরিস-২ নেটওয়ার্কের মূল স্যাটেলাইটের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩৪৮-এ।

ইউরোপীয় কমিশনের এই উদ্যোগকে মহাকাশভিত্তিক নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে ইউরোপের বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ইউরোপ নিজস্ব স্যাটেলাইটভিত্তিক ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারবে এবং সংকট বা জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য বাইরের প্রযুক্তিনির্ভরতার পরিমাণ কমাতে পারবে।

ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির (ইএসএ) সহায়তায় গত ৭ আগস্ট ‘স্পেসরাইজ’ কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের চুক্তি সই করে ইউরোপীয় কমিশন। এর মাধ্যমে আইরিস-২ প্রকল্পটি কেবল পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দিকে আরও এগিয়ে গেল।

স্টারলিংকের বিকল্প তৈরির উদ্যোগ

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট–সেবা দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এই খাতে সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে বিপুলসংখ্যক স্যাটেলাইট স্থাপন করে স্টারলিংক প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাতেও উচ্চগতির ইন্টারনেট সরবরাহের ব্যবস্থা তৈরি করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইরিস-২ প্রকল্পও একই ধরনের স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। তবে প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য শুধু বাণিজ্যিক ইন্টারনেট সরবরাহ নয়। ইউরোপের সরকার, প্রতিরক্ষা ও সামরিক বাহিনী এবং জরুরি সেবা সংস্থাগুলোর জন্য একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলাই এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

বিশেষ করে সংকট, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে আইরিস-২ নেটওয়ার্ক ইউরোপের জন্য বিকল্প যোগাযোগ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে।

৩৪৮টি স্যাটেলাইটের বহর

নতুন চুক্তির আওতায় আরও ৬৬টি কৃত্রিম উপগ্রহ যুক্ত হওয়ার পর আইরিস-২-এর মূল বহরে মোট ৩৪৮টি স্যাটেলাইট থাকবে। এর মধ্যে ৩৩০টি স্যাটেলাইট পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে বা লো আর্থ অরবিটে (এলইও) এবং ১৮টি স্যাটেলাইট মধ্যম পৃথিবী কক্ষপথে বা মিডিয়াম আর্থ অরবিটে (এমইও) অবস্থান করবে।

বিভিন্ন কক্ষপথে স্যাটেলাইট স্থাপনের মাধ্যমে নেটওয়ার্কটির যোগাযোগ সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে ইউরোপীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ মিশনের জন্য অতিরিক্ত সুবিধাও রাখা হবে।

স্যাটেলাইটগুলোর সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে আইরিস-২ একটি বিস্তৃত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে স্থলভিত্তিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা অকার্যকর হয়ে পড়লে মহাকাশভিত্তিক এই নেটওয়ার্ক যোগাযোগ সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নিরাপত্তা ও কৌশলগত গুরুত্ব

ইউরোপের জন্য আইরিস-২ প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু ইন্টারনেট–সেবা বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে ইউরোপের কৌশলগত নিরাপত্তা ও যোগাযোগের স্বাধীনতার বিষয়টিও জড়িত।

বর্তমানে সংকটকালীন যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান বেসরকারি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় স্টারলিংক নেটওয়ার্কের ব্যবহারও স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থার কৌশলগত গুরুত্বকে সামনে এনেছে। ফলে ইউরোপের নিজস্ব নিরাপদ স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির আগ্রহ আরও বেড়েছে।

আইরিস-২ নেটওয়ার্ক ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারি যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা কার্যক্রম এবং জরুরি সেবার জন্য একটি বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করবে। এর মাধ্যমে সংকটকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও যোগাযোগ নিরাপদে আদান-প্রদান করার সক্ষমতা বাড়বে।

এ ছাড়া প্রকল্পটি ইউরোপের প্রযুক্তিগত ও মহাকাশ সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে। মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থায় নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ইউরোপ আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট–ইন্টারনেট বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে চাইছে।

জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ যোগাযোগ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন এই ফ্ল্যাগশিপ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের অন্যতম লক্ষ্য হলো যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতেও নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাইবার হামলা, সামরিক সংঘাত কিংবা অন্য কোনো কারণে স্থলভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক দ্রুত বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

সরকারি ও জরুরি সেবা সংস্থার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতেও এর ব্যবহার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে আইরিস-২ ভবিষ্যতে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অবকাঠামোর অংশ হয়ে উঠতে পারে।

৬৬টি নতুন স্যাটেলাইট যুক্ত করার চুক্তি সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে একটি বড় অগ্রগতি। এর মাধ্যমে ইউরোপ শুধু স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট–সেবায় নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করছে না, একই সঙ্গে নিরাপদ যোগাযোগ ও কৌশলগত স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রেও নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

ফলে আইরিস-২ প্রকল্প পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে স্টারলিংকসহ বিশ্বের অন্যান্য স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ইউরোপের নিজস্ব একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি হতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স