সুনামগঞ্জের দিরাই পৌর শহরে বিএনপির সংসদ সদস্য নাছির চৌধুরীর সমাবেশের এক দিন পর ১৪৪ ধারা ভেঙে পাল্টা সমাবেশ করেছেন তাঁর ছোট ভাই ও দিরাই উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুক চৌধুরী। শনিবার বেলা দুইটার দিকে শহরের বাগানবাড়ি এলাকায় জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে মাসুক চৌধুরী দাবি করেন, তাঁর আয়োজন বড় ভাই নাছির চৌধুরীর বিরুদ্ধে নয়; বরং তাঁকে একটি ‘সিন্ডিকেটের’ কবল থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যেই এই সমাবেশ। তিনি নাছির চৌধুরীর আশপাশে থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
তবে নাছির চৌধুরীর অনুসারীরা এ সমাবেশকে বিএনপির দলীয় সমাবেশ হিসেবে স্বীকার করেননি। তাঁদের বক্তব্য, সংসদ সদস্য নিজে উপস্থিত না থাকায় এটি বিএনপির কোনো আনুষ্ঠানিক সমাবেশ নয়।
এদিকে সমাবেশকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার আশঙ্কায় শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দিরাই শহরের থানা পয়েন্ট ও বাগানবাড়ি এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছিল উপজেলা প্রশাসন। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই দুপুরের পর সমাবেশস্থলে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী জড়ো হলে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ ও প্রশাসন আর বাধা দেয়নি।
ভাইয়ের বিরুদ্ধে নয়, ‘সিন্ডিকেটমুক্ত’ করার দাবি
শনিবারের সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন মাসুক চৌধুরী। তিনি বলেন, এই সমাবেশ তাঁর ভাই নাছির চৌধুরীর বিরুদ্ধে নয়। বরং তাঁকে ঘিরে থাকা একটি ‘লুটেরা সিন্ডিকেট’ থেকে তাঁকে মুক্ত করার জন্যই নেতা-কর্মীরা মাঠে নেমেছেন।
মাসুক চৌধুরী বলেন, নাছির চৌধুরী প্রায় ৪০ বছর ধরে দিরাই–শাল্লা এলাকায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে তাঁর আশপাশে এমন কিছু মানুষ অবস্থান নিয়েছেন, যাঁদের কারণে তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, সারা জীবন চোরের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে এখন ডাকাতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, তাঁরা নাছির চৌধুরীকে লুটেরা সিন্ডিকেটের কবল থেকে মুক্ত করতে চান।
নিজেকে নাছির চৌধুরীর কর্মী হিসেবে উল্লেখ করে মাসুক বলেন, তাঁরা সবাই তাঁর কর্মী এবং তাঁকে ভালোবাসেন। তাই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাঁরা কথা বলছেন।
‘আয়নাঘর থেকে মুক্ত হয়ে এখন আয়নাঘরে বন্দী’
সমাবেশে নাছির চৌধুরীর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বক্তব্য দেন তাঁর ছোট ভাই।
মাসুক চৌধুরী বলেন, কেউ কেউ মনে করেন নাছির চৌধুরী ‘আয়নাঘর’ থেকে মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি এখনো এক ধরনের ‘আয়নাঘরে বন্দী’ রয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, সাধারণ মানুষ নাছির চৌধুরীর কাছে সহজে যেতে পারছেন না এবং তাঁর আশপাশে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করছেন।
মাসুকের দাবি, এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের কর্মকাণ্ডের কারণে শুধু নাছির চৌধুরীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বিএনপিরও ক্ষতি হচ্ছে।
এ সময় তিনি বলেন, দলের পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়ম বা দুর্নীতির সুযোগ নেওয়া হলে তার দায় শেষ পর্যন্ত দল ও সরকারের ওপর গিয়ে পড়ে।
কৃষি কার্ড বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ
সমাবেশে কৃষি কার্ড বিতরণ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন মাসুক চৌধুরী।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর বিএনপির নেতা-কর্মীরা যেভাবে বঞ্চিত হয়েছেন, এখনো সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন পুরোপুরি হয়নি। সামনে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণেও যদি অনিয়ম হয়, তাহলে তার পরিণতি ভালো হবে না বলে সতর্ক করেন তিনি।
মাসুকের অভিযোগ, সংসদ সদস্যের আশপাশে থাকা কিছু ব্যক্তির অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বিএনপি, সরকার এবং দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি সরকারি সুবিধা বিতরণে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
এক দিন আগেই নাছিরের বক্তব্য
মাসুক চৌধুরীর সমাবেশের ঠিক এক দিন আগে বৃহস্পতিবার দিরাই শহরের থানা পয়েন্টে বিএনপির একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য নাছির চৌধুরী।
ওই সমাবেশে নিজের ছোট ভাইকে ইঙ্গিত করে নাছির চৌধুরী বলেছিলেন, তাঁর কোনো ভাই নেই, তিনি একা। একই সঙ্গে তাঁর বাসা কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাছির চৌধুরীর অভিযোগ ছিল, দলের নাম ব্যবহার করে যারা চুরি ও দুর্নীতি করার সুযোগ পাচ্ছে না, তারাই তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।
ফলে দুই ভাইয়ের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দিরাইয়ের স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিরোধে রূপ নিয়েছে।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কের পর দূরত্ব
নাছির চৌধুরী সুনামগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য। তিনি বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা। দীর্ঘদিন ধরে দিরাই–শাল্লা এলাকায় দলটির রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব রয়েছে।
তবে সংসদ সদস্য হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে ছোট ভাই মাসুক চৌধুরীর রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও পৃথক কর্মসূচির কারণে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একদিকে নাছির চৌধুরীর অনুসারীরা তাঁর নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলছেন। অন্যদিকে মাসুক চৌধুরীর অনুসারীরা সংসদ সদস্যকে ঘিরে থাকা ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
১৪৪ ধারা জারি, তারপরও সমাবেশ
শনিবারের সমাবেশকে কেন্দ্র করে শুক্রবার রাত থেকেই দিরাই শহরে উত্তেজনা তৈরি হয়। রাতে দুই পক্ষ পৃথক মিছিল বের করে।
শনিবার সকালে নাছির চৌধুরীর অনুসারী বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মী শহরের থানা পয়েন্টে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় সংঘাত এড়াতে উপজেলা প্রশাসন সকালে থানা পয়েন্ট ও বাগানবাড়ি এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে।
প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এসব এলাকায় সভা, সমাবেশ ও জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।
তবে দুপুরের দিকে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা বাগানবাড়ি এলাকার সমাবেশস্থলে জড়ো হতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেখানে লোকসমাগম বাড়তে থাকে।
প্রথমদিকে প্রশাসন ও পুলিশ সমাবেশে বাধা দেওয়ার উদ্যোগ নিলেও পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাধা দেওয়া হয়নি। ফলে ১৪৪ ধারা বহাল থাকা অবস্থাতেই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশাসনের ব্যাখ্যা
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জীব সরকার বলেন, শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত থানা পয়েন্ট ও বাগানবাড়ি এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি ছিল।
তিনি বলেন, সকালে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। এরপর সমাবেশস্থলে ব্যাপক লোকসমাগম হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসন ও পুলিশ পরে সমাবেশে আর বাধা দেয়নি।
প্রশাসনের এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানো এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাকেই তখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
‘এটি বিএনপির সমাবেশ নয়’: নাছিরপন্থীদের দাবি
মাসুক চৌধুরীর সমাবেশকে বিএনপির দলীয় কর্মসূচি হিসেবে মানতে নারাজ নাছির চৌধুরীর অনুসারীরা।
দিরাই উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির তালুকদার বলেন, সংসদ সদস্য নাছির চৌধুরী ওই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন না। তাই এটিকে বিএনপির সমাবেশ হিসেবে তাঁরা বিবেচনা করেননি।
তিনি বলেন, এ কারণেই নাছির চৌধুরীর অনুসারীরা ওই কর্মসূচিতে অংশ নেননি।
অন্যদিকে মাসুক চৌধুরীর পক্ষের নেতারা বলছেন, তাঁরা বিএনপির রাজনীতির অংশ হিসেবেই সমাবেশ করেছেন এবং দলের নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যা ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেছেন।
ফলে একই দলের দুই পক্ষের মধ্যে কোনো কর্মসূচি ‘দলীয়’ কি না, তা নিয়েও বিভক্তি তৈরি হয়েছে।
সমাবেশে যাঁরা বক্তব্য দেন
দিরাই পৌর বিএনপির সদস্যসচিব ইকবাল চৌধুরীর সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল কাইয়ুম, দিরাই পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল করিম চৌধুরী ও আমিরুল ইসলাম।
এ ছাড়া উপজেলা বিএনপির সদস্য সোয়েব হাসান ও সুমন মিয়া এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা আবুল হাসনাত বক্তব্য দেন।
বক্তারা স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যা, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং দলীয় রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
স্থানীয় বিএনপির বিরোধে নতুন মাত্রা
দিরাইয়ে দুই ভাইয়ের রাজনৈতিক বিরোধ এখন আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। পৃথক সমাবেশ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং দলীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্কের মধ্য দিয়ে তা স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
একদিকে নাছির চৌধুরী তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও দলের নাম ব্যবহার করে অনিয়মের অভিযোগকারীদের সমালোচনা করছেন। অন্যদিকে মাসুক চৌধুরী তাঁর বড় ভাইয়ের নেতৃত্ব নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন না তুলে তাঁর চারপাশের লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন এবং তাঁকে ‘সিন্ডিকেটমুক্ত’ করার কথা বলছেন।
এর মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি থাকা অবস্থায় পাল্টা সমাবেশের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও আলোচনায় এনেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, দুই পক্ষের এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক মতপার্থক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দিরাই–শাল্লা আসনের বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি বিভাজন তৈরি করবে। প্রশাসনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যাতে সংঘাত বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, তা নিশ্চিত করা।