ঢাকা

কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের ঘোষণা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
পাহাড়ি নারী নেত্রী কল্পনা চাকমার অপহরণের ৩০ বছর পূর্ণ হলেও এখনো তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি। দীর্ঘ তিন দশকেও এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী, নারী নেত্রী ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডির ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে কল্পনা চাকমার অন্তর্ধানের ৩০ বছর উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ আহ্বান জানানো হয়। পাহাড়ি নারীদের সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশন এ সভার আয়োজন করে। কল্পনা চাকমা সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

আলোচনা সভার প্রতিপাদ্য ছিল—‘আদিবাসীসহ সকল নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ কর, কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনায় অভিযুক্ত লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস গংদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত কর’।

তিন দশকেও মেলেনি কল্পনা চাকমার সন্ধান

১৯৯৬ সালের ১২ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাল্যাঘোনা এলাকা থেকে কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। সে সময় তিনি হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। তবে ঘটনার পর ৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও কল্পনা চাকমার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি এবং ঘটনার বিচারও সম্পন্ন হয়নি।

‘কল্পনা চাকমা এখন আরও শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছেন’

আলোচনা সভায় অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, অপহরণের পর কল্পনা চাকমার আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছে। তাঁর আদর্শ ও সংগ্রাম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গত ৩০ বছরে অসংখ্য মানুষ অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন।

তিনি বলেন, কল্পনা চাকমা এখন শুধু একটি ব্যক্তির নাম নয়, বরং ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তাঁর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

শামসুল হুদা আশা প্রকাশ করেন, সরকার যদি ‘রেইনবো নেশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগিয়ে যায়, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের পথ দ্রুততর হতে পারে।

তিনি পার্বত্য অঞ্চলের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেও বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিন দফা দাবি হিল উইমেন্স ফেডারেশনের

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি শান্তিদেবী তঞ্চঙ্গ্যা। তিনি সরকারের কাছে তিনটি দাবি তুলে ধরেন।

দাবিগুলো হলো—

১. কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা।
২. ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা।
৩. ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারীদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত এবং পার্বত্য সমস্যার সমাধানে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা।

বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহসাধারণ সম্পাদক গজেন্দ্রনাথ মাহাতো বলেন, পাহাড় ও সমতলের নারীদের ওপর নির্যাতন বৃদ্ধির পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বড় কারণ।

তিনি বলেন, শুধু আলোচনা বা সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ঘোষণার দাবিও জানান তিনি।

সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা ও প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় হতাশা থেকেই হয়তো তিনি পদত্যাগ করেছেন।

তদন্ত না হওয়ায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা: বক্তারা

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং পরিচালক জনা গোস্বামী বলেন, গত তিন দশকে দেশে একাধিকবার সরকার পরিবর্তন হলেও কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনার কার্যকর তদন্ত হয়নি।

তিনি অভিযোগ করেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী যখনই নিজেদের অধিকার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, তখনই তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহসাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, কল্পনা চাকমার অন্তর্ধানসহ সাম্প্রতিক গুমের ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়া রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রকাশ।

তিনি কল্পনা চাকমার স্মৃতি ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে প্রতিবছর তাঁর জীবন ও আন্দোলন নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজনের আহ্বান জানান।

নারীদের অনলাইন হয়রানি নিয়েও উদ্বেগ

বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, সময়ের সঙ্গে নারীদের ওপর নির্যাতনের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি বর্তমানে অনলাইনে নারীদের হয়রানি একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানি বন্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারহা তানজিম বলেন, দেশের দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে অনেক মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমি দখল, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ

হিল উইমেন্স ফেডারেশন ঢাকা মহানগরের সদস্য কলি চাকমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য দেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক চন্দ্রিকা চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক হ্লামংচিং মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সদস্য মনিরা ত্রিপুরা, ঢাকাস্থ জুম্ম প্রতিনিধি অজয় প্রকাশ চাকমা, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অর্থবিষয়ক সম্পাদক জানকি চিছিম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য লুনা নূর এবং বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহানাজ সুমীসহ অনেকে।

বক্তারা বলেন, কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার শুধু একটি ঘটনার বিচার নয়; এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, নারী অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স