ঢাকা

আর হামলা না করার শর্তে আমিরাত থেকে হাজার কোটি ডলার পাচ্ছে ইরান: রয়টার্স এক্সক্লুসিভ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানের জন্য কয়েক শ কোটি ডলারের তহবিল ছাড় দিতে রাজি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স। দীর্ঘ যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে এই আর্থিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাতের সময় দফায় দফায় আমিরাতের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় তেহরান। এরপরই আবুধাবি তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনে এবং দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে এই আর্থিক সমঝোতার পথে এগোয়।

হাজার কোটি ডলারের তহবিল ছাড়ের সমঝোতা

দুটি আঞ্চলিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত মোট প্রায় ১ হাজার কোটি (১০ বিলিয়ন) ডলার ইরানকে ছাড়তে রাজি হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) ডলারের বেশি অর্থ হস্তান্তর করা হয়েছে।

তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরও দুটি সূত্র বলছে, মোট ছাড়ের পরিমাণ ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—ইরান ভবিষ্যতে আমিরাতের ওপর আর কোনো হামলা চালাবে না।

অর্থের উৎস নিয়ে অনিশ্চয়তা

রয়টার্স জানিয়েছে, এই অর্থ আমিরাতের নিজস্ব তহবিল কিনা, নাকি বিদেশি ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা ইরানের তেল বিক্রির অর্থ—তা নিশ্চিত করা যায়নি।

ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। কূটনীতিকদের ধারণা, চলমান আলোচনায় সেই অর্থ ছাড়ের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

আমিরাতের অবস্থান: উত্তেজনা কমানোই লক্ষ্য

অর্থ হস্তান্তর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

তিনি বলেন, “পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা কমানো এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।”

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রসহ যেকোনো উদ্যোগকে তারা সমর্থন করে।

ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ও শর্ত

হোয়াইট হাউসে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, কোনো চুক্তি বা আলোচনায় অংশ নেওয়ার কারণে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ পাবে না। বরং অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হবে ধাপে ধাপে এবং শর্তসাপেক্ষে।

তার ভাষায়, ইরান কেবল তখনই সুবিধা পাবে, যখন তারা তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে।

কূটনৈতিক সমঝোতার নতুন কাঠামো

সমঝোতার বিষয়ে অবগত সূত্রগুলোর দাবি, এই আর্থিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষের জন্যই একটি “কৌশলগত সমাধান” হিসেবে কাজ করতে পারে।

একটি সূত্রের মতে, এই ব্যবস্থায় তিন পক্ষই নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে—

ইরান দাবি করতে পারবে যে তারা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ পেয়েছে
যুক্তরাষ্ট্র বলতে পারবে, তারা সরাসরি অর্থ দেয়নি
আর সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক সুনাম বজায় রাখতে পারবে
শর্তসাপেক্ষে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমঝোতা

আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, এই আর্থিক সমঝোতার বিনিময়ে ইরান আমিরাতের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধ করবে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা পুনর্গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

সূত্রটি আরও জানায়, একই ধরনের সমঝোতার জন্য ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত আরও দুটি দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে।

সংঘাত ও ক্ষতির প্রেক্ষাপট

যুদ্ধ চলাকালে ইরানের হামলায় আমিরাতের কিছু এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে দুবাইয়ের পর্যটন ও ব্যবসায়িক খাতে। নিরাপদ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে আমিরাতের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর একটি কৌশলগত উদ্যোগ।

কূটনৈতিক যোগাযোগ ও গোপন আলোচনা

রয়টার্সের সূত্র অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (IRGC) কর্মকর্তারা আবুধাবি সফর করেন এবং সেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেন।

এর পরপরই উভয় পক্ষের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার গতি বৃদ্ধি পায় এবং চুক্তির খুঁটিনাটি নির্ধারণে তেহরান ও আবুধাবির মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

দুবাইয়ে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ

বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা দুবাইয়ের ব্যাংকিং খাতে থাকা ইরানের দীর্ঘদিনের আটকে থাকা সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো ইরানের অর্থ লেনদেন সীমিত করে রেখেছে। ফলে বহু বছর ধরে ইরানের বিপুল অর্থ বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে আছে।

অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো সতর্ক করে বলেছে, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং এর শর্ত ও বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চলমান।

একটি সূত্রের মতে, এই সমঝোতা হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ বাণিজ্য চলাচল নিশ্চিত করার বৃহত্তর কূটনৈতিক আলোচনার অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই আর্থিক ও নিরাপত্তা সমঝোতা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলেও এটি আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স