দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত বাজেটের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও বাস্তবায়নযোগ্যতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এটি অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।
শুক্রবার (১২ জুন) দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিন, চট্টগ্রাম নগরের আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইবসহ দলের অন্যান্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আগামীকাল চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিতব্য ১১–দলীয় ঐক্যের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁদের।
‘ইতিবাচক দিক থাকলেও বাস্তবায়নযোগ্য নয়’
নাহিদ ইসলাম বলেন, বাজেটে কিছু খাতে ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে, যেমন কিছু পণ্যের কর হ্রাস এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
তার ভাষায়, “বাজেটে কিছু সৃজনশীল জায়গা তারা দেখিয়েছে। কিছু পণ্যের কর কমিয়েছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে—এগুলো ভালো উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে আমরা সন্দিহান।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান কাঠামোর মধ্যে থেকে এই বাজেট অর্থনৈতিক সংস্কার আনতে পারবে না।
তিনটি খাতে মৌলিক সংকটের ইঙ্গিত
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের অর্থনীতির মূল সংকট তিনটি খাতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান—ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাত এবং কর্মসংস্থান।
তিনি বলেন, “বাজেট–ঘাটতি পূরণে সরকারকে ঋণ নিতে হবে, এতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাবে। ফলে বিনিয়োগ কমবে এবং কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে।”
তার মতে, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাজেটে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি।
দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন
নাহিদ ইসলাম বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, বড় বাজেট মানেই বড় দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।
তার ভাষায়, “বড় বাজেট মানে বড় দুর্নীতির সুযোগ। বিভিন্ন প্রকল্প যেমন কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি—এসবের বরাদ্দে স্বচ্ছতা নেই। কোথাও কোনো কার্যকর জবাবদিহি নেই।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা যে পরিমাণ বরাদ্দ পান, বিরোধী দলের এমপিরা তা পান না, যা বৈষম্য সৃষ্টি করছে।
ব্যাংকিং খাত ও পাচার অর্থ নিয়ে উদ্বেগ
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, বড় বড় অর্থপাচারকারী ও ‘মাফিয়া চক্র’ নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপের কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা বাজেটে নেই।
তিনি বলেন, “এস আলমসহ যারা ব্যাংক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট অবস্থান দেখা যায়নি। বরং ইসলামী ব্যাংক আবারও তাদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার চেষ্টা চলছে—এটি উদ্বেগজনক।”
তিনি আরও বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নাজুক অবস্থায় রয়েছে এবং বড় কোনো ব্যাংকের ওপর আস্থা সংকট তৈরি হলে তা পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অর্থনৈতিক নীতিতে দিকনির্দেশনার অভাব
নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান বাজেট দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল বা পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
তার ভাষায়, “এই বাজেট ভঙ্গুর অর্থনীতিকে দিশা দেখাতে পারেনি। তাই আমাদের সমালোচনা থাকবে, তবে আমরা শুধু সমালোচনা নয়, প্রস্তাবনাও দিচ্ছি।”
তিনি জানান, এনসিপি সংসদে ও সংসদের বাইরে অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে তাদের অবস্থান অব্যাহতভাবে তুলে ধরবে।
রাজনৈতিক প্রসঙ্গ ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে মন্তব্য
সংবাদ সম্মেলনের বাইরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ একটি সংগঠনের মিছিল প্রসঙ্গে কথা বলেন।
তিনি বলেন, “নিষিদ্ধ সংগঠন কীভাবে মাঠে মিছিল করে, সে বিষয়ে সরকারের কাছে আমরা জবাব চাই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব এটি নিয়ন্ত্রণ করা।”
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো উদ্বিগ্ন এবং এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
নেতারা আশা প্রকাশ করেন, আগামী জাতীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দলীয় অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে।