বিএনপি সরকার ঘোষিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নে তিনটি প্রধান বাধা রয়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির মতে, জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—এই তিনটি বিষয় বাজেট বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
শুক্রবার (১২ জুন) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন।
‘জ্বালানি ব্যয়ই প্রথম বড় বাধা’
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান ব্যয়।
তিনি বলেন, “বর্তমান সরকারের মেয়াদে গত কয়েক মাসে দফায় দফায় গ্যাস ও জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ব্যয় বৃদ্ধি অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।”
তার মতে, জ্বালানি খাতের অস্থিতিশীলতা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা দ্বিতীয় ও তৃতীয় বাধা
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের দ্বিতীয় বড় বাধা হলো লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
তিনি বলেন, “উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। এতে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি।”
তৃতীয় বাধা হিসেবে তিনি বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে উল্লেখ করেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিরতা বাংলাদেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে।
তিনি বলেন, এই তিনটি বাধার কারণে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও “খুব কঠিন” হয়ে পড়বে।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয়।
তার ভাষায়, “রাজস্ব আহরণের যে কাঠামো দেখানো হয়েছে, সেখানে প্রয়োজনীয় কর সংস্কার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির স্পষ্ট রূপরেখা নেই। এগুলো ছাড়া এত বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, কর বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার “ভাষাগত কৌশলের মাধ্যমে আড়াল করার চেষ্টা করেছে”।
প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন
৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে “চটকদার সিদ্ধান্ত” হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াত নেতা বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসের সঙ্গে এই লক্ষ্যমাত্রার কোনো সামঞ্জস্য নেই।
তিনি বলেন, “বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ দুর্বল, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা রয়েছে, দুর্নীতি ও বৈষম্য বাড়ছে—এ অবস্থায় উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয়।”
এছাড়া ৭.৫ শতাংশে মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। তার মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে, ফলে মূল্যস্ফীতি কমার বদলে বাড়তে পারে।
করনীতি, এডিপি ও ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগ
ব্যক্তিগত করের সর্বনিম্ন হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাবের সমালোচনা করে জামায়াত বলেছে, এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে।
অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ বাতিলেরও দাবি জানায় দলটি।
এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) তিন লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করা হলেও তা বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা না থাকলে দুর্নীতির সুযোগ বাড়বে বলে সতর্ক করা হয়।
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, “জনগণের অর্থ লুটপাট করে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সুবিধা পেয়েছে। একই ধরনের নীতি অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন হবে না।”
রাজনৈতিক মন্তব্য ও নির্বাচনী প্রসঙ্গ
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে জনগণ যে জনবান্ধব বাজেট আশা করেছিল, বর্তমান প্রস্তাবিত বাজেট সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও দলীয় লুটপাটের ঝুঁকি রয়েছে।
তার ভাষায়, “যদি গণরায় বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে বাজেট কার্যত লুটপাটের সুযোগে পরিণত হবে।”
জনকল্যাণমূলক বাজেটের আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনের শেষে জামায়াতে ইসলামী বাজেটকে সংশোধন করে জনকল্যাণমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব করার আহ্বান জানায়।
সংগঠনটি মনে করে, বর্তমান কাঠামো পরিবর্তন না করলে বাজেট অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম, হামিদুর রহমান আযাদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম, আতাউর রহমান সরকারসহ দলের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।