যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমঝোতার লক্ষ্যে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। প্রস্তাবিত এই চুক্তির আওতায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে জানান, চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ প্রত্যাহার। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তী ধাপে নেওয়া হবে।
মার্কিন কর্মকর্তারাও চুক্তির কিছু অংশ নিশ্চিত করেছেন। তবে তারা বলেছেন, ইরান অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে কি না, তা নির্ভর করবে তেহরান তাদের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করে তার ওপর।
হরমুজ প্রণালি ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এই পথ সাময়িকভাবে বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়।
ইরান এর আগে পারস্য উপসাগরে উত্তেজনার সময় প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত বন্ধের পদক্ষেপ নিয়েছিল। এবার সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে এটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য ও আলোচনার অগ্রগতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার জানান, তিনি ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত কিছু সামরিক হামলা বাতিল করেছেন। তার দাবি অনুযায়ী, দুই পক্ষের আলোচকরা একটি “চমৎকার সমঝোতায়” পৌঁছেছে এবং শিগগিরই চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে।
তবে পরবর্তীতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ চুক্তির কাঠামো ও শর্ত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা উঠে এসেছে।
১৪ দফা খসড়া ও বিতর্ক
ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ১৪ দফা চুক্তির খসড়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওই খসড়াকে সরাসরি নাকচ করে বলেন, এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বা আলোচনার শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই।
এই বিভ্রান্তির মধ্যেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা ও আলোচনা জোরালো হয়।
মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ও আঞ্চলিক ভূমিকা
এর কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি এখন অনুমোদনের অপেক্ষায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
যুদ্ধবিরতি ও চলমান উত্তেজনা
প্রাথমিকভাবে গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তবে এরপরও দুই দেশের মধ্যে মাঝেমধ্যেই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে চলেছে।
চলতি সপ্তাহেও দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে হামলার খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আবারও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাথমিক সমঝোতার পর ৬০ দিনের একটি আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনার অংশ হিসেবে এই উপাদান ইরানের অভ্যন্তরেই নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করা হতে পারে এবং পরবর্তীতে তা সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে এর সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি এখনো নির্ধারিত হয়নি।
অর্থনৈতিক শর্ত ও নিষেধাজ্ঞা ইস্যু
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক সুবিধা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, ইরানকে কোনো আগাম অর্থ প্রদান করা হবে না। বরং তারা ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হবে।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইরানের আটকে থাকা সম্পদ অবমুক্ত করার প্রক্রিয়াও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে—যা নির্ভর করবে ইরানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর।
আঞ্চলিক প্রভাব ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
চুক্তির খসড়ায় হিজবুল্লাহসহ ইরানের আঞ্চলিক সহযোগী বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করার বিষয়েও আহ্বান রয়েছে।
এদিকে ইসরায়েল এই আলোচনায় অংশ না নেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আঞ্চলিক ভারসাম্য ও নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়ে গেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে
ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদ—সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ভেতরে চুক্তির শর্ত নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে বলে জানা গেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যকার এই জটিল কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চুক্তিকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনো অনেক অনিশ্চয়তা বিদ্যমান।
চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।