ঢাকা

‘একই শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার প্রশ্ন আলাদা হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা দরকার’: শিক্ষামন্ত্রী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য কমাতে আসন্ন এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ সালে দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ‘একক ও অভিন্ন’ প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘ও লেভেল’ ও ‘এ লেভেল’ পরীক্ষার ক্ষেত্রে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হলে বাংলাদেশের বোর্ডভিত্তিক পরীক্ষায় আলাদা প্রশ্নপত্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বোর্ডভেদে প্রশ্নের মানের পার্থক্য ও ফলাফলের বৈষম্য দূর করতেই এবার অভিন্ন প্রশ্নপত্রের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৬ জুন ২০২৬) আসন্ন এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা উপলক্ষে বরিশাল অঞ্চলের কেন্দ্রসচিবদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। বরিশাল শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড এ সভার আয়োজন করে।

সভায় মন্ত্রী প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, প্রশ্নফাঁসের যেকোনো ধরনের অপচেষ্টা বা অনিয়ম কঠোরভাবে দমন করা হবে। তিনি বলেন, এবার প্রশ্নফাঁসের চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়।

অভিন্ন প্রশ্নপত্রে দূর হবে জিপিএ বৈষম্য

মন্ত্রী বলেন, ‘সারা বিশ্বে যদি “ও লেভেল বা এ লেভেল” পরীক্ষা একই প্রশ্নে হতে পারে, তবে আমাদের দেশে বোর্ডভেদে আলাদা প্রশ্ন কেন হবে?’

তিনি বলেন, অতীতে অনেক সময় বোর্ডের প্রশ্নপত্রের মানে পার্থক্য থাকায় শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। কোনো বোর্ডের প্রশ্ন তুলনামূলক সহজ এবং অন্য বোর্ডের প্রশ্ন কঠিন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে।

আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বোর্ড চেয়ারম্যানরা আগে প্রশ্নফাঁসের আশঙ্কার কারণে আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরির পক্ষে যুক্তি দিতেন। তবে তার অবস্থান হলো, প্রশ্নফাঁস বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরি করা সমাধান নয়।

তিনি বলেন, “প্রশ্ন ফাঁসই হতে দেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীদের জিপিএ বৈষম্যের মানসিকতা থেকে মুক্ত করতেই একক ও অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব

বিগত সরকারের সময়কার শিক্ষানীতির সমালোচনা করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার প্রকৃত মান ফিরিয়ে আনতে হলে যোগ্যতা ও মেধাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে পড়াশোনা ও দক্ষতার পরিবর্তে নকল, অনৈতিক সুবিধা এবং যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া শিক্ষার্থীদের পাস করানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। এর ফলে শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, “মেধার কোনো বিকল্প নেই। একজন শিক্ষার্থী প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন না করলে শুধু সনদ দিয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।”

তিনি আরও বলেন, শিক্ষকদেরও অনেক সময় বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। বর্তমান সরকার শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং একটি জবাবদিহিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে।

মন্ত্রী বলেন, “যে কয়েক দিন থাকব, সিংহের মতো চলব, শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে ছাড়ব।”

মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন নিয়ে আশ্বাস

মাদ্রাসা শিক্ষকদের বকেয়া বেতন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, অতীতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ছাড়াই বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কারণে অর্থ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, মাদ্রাসা শিক্ষকদের মে মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১০০ কোটি টাকা জনতা ব্যাংকে ছাড় করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আংশিকভাবে শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ করা হবে।

তিনি আশ্বাস দেন, আগামী জুলাইয়ের মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মে ও জুন মাসের বকেয়া বেতনসহ অন্যান্য পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে।

এ ছাড়া শিক্ষকদের বেতন অনলাইনে পাঠানোর জন্য নেওয়া ইএফটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। মন্ত্রী জানান, ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হলেও এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। প্রকল্পটি শেষ করার জন্য আরও এক বছর সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরীক্ষার শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ

শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মচারীদের পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে।

তিনি কেন্দ্রসচিব ও পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরীক্ষার পরিবেশ সুষ্ঠু ও শৃঙ্খলাপূর্ণ রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কোনো পরীক্ষার্থীকে অন্যায় সুবিধা না দেওয়া এবং পরীক্ষার নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেন।

সভায় বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু, বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. মামুন উর রশিদ, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ইউনুছ আলী সিদ্দিকী, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান।

মতবিনিময় সভায় বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, কেন্দ্রসচিব এবং পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স