বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের বিষয়গুলো উপেক্ষা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের বড় অংশের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
শুক্রবার সকালে রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আফসোস! বর্তমান সরকারি দল প্রায় ৭০ ভাগ জনগণের এই মতকে অগ্রাহ্য করল। ফলে আমরা যেখানে ছিলাম, সেখানেই থেকে গেলাম। কোনো পরিবর্তন আসল না।’
তিনি বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের পর জনগণ রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোর পরিবর্তন চেয়েছিল। সেই লক্ষ্যেই সংস্কারের সনদ তৈরি করা হয় এবং এর ভিত্তিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও সরকার শুধু সংসদ নির্বাচনের ফলকে গুরুত্ব দিয়েছে, গণভোটের রায় কার্যকর করেনি।
‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’
জামায়াত আমির বলেন, কেউ কেউ বলতে পারেন, সরকারকে আরও সময় দেওয়া উচিত। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শুরুতেই দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘ফাউন্ডেশনের ওপরেই একটা দেশ এবং রাষ্ট্র চলে। মর্নিং শোজ দ্য ডে। দিনটি কেমন যাবে, সকালবেলাই তা বলে দেবে।’
নির্বাচনের আগে সরকারি দল ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষই গণভোটের ফল মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে দাবি করেন শফিকুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় উপেক্ষা করার কারণে জাতীয় জীবনে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।
সংস্কার বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ
সরকার স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, স্বাধীন গুম কমিশন এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি বলেও অভিযোগ করেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, যেসব জায়গার দুর্বলতার কারণে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সেসব ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়নি।
শফিকুর রহমানের ভাষায়, ‘এভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে জায়গাগুলোর কারণে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল, সেই সব জায়গা আগের জায়গায় থেকে গেল।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্ঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, সমাজে স্বাভাবিক পরিস্থিতি নেই। খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের ঘটনা বেড়ে চলেছে।
গাইবান্ধায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের এক নেতা হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেও এমন ঘটনা ঘটছে, যা উদ্বেগজনক।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করলেও নিজের মন্ত্রণালয়ের দিকে যথাযথ নজর দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।
সরকারের প্রতি সহযোগিতার আশ্বাস
সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকার দেশের স্বার্থে ভালো কোনো উদ্যোগ নিলে বিরোধী দল সহযোগিতা করবে। তবে জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার প্রতিবাদ করা হবে।
তিনি বলেন, এই প্রতিবাদ সংসদের ভেতরে ও বাইরে চলবে। অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে বিরোধী দল তাদের অবস্থান অব্যাহত রাখবে।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘যেখানেই ফ্যাসিবাদ, সেখানেই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।’
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আরও ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে হবে।
ভুল ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান
নিজেদের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনগণের সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, দলীয় কোনো কার্যক্রম দেশ ও জাতির স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে জনগণ যেন তা তুলে ধরে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ভুল ধরিয়ে দেবেন। প্রয়োজনে প্রতিবাদও করবেন। আমরা স্বাগত জানাব।’
সীমান্ত ও জাতীয় ঐক্যের প্রসঙ্গ
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ রয়েছে এবং সীমান্ত রক্ষায় বিজিবির পাশে জনগণ আছে।
তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তাঁর মতে, জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে আধিপত্যবাদ মোকাবিলা করা সম্ভব।
স্বাধীনতার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি: জামায়াত আমির
বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও জনগণের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তাদের ব্যর্থতার কারণে এখনো দেশে সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার এই অধিবেশনে দলের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান, আ ন ম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও মজলিশে শুরার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।