ঢাকা

ড্রোনকে অস্ত্র হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া, প্রশিক্ষণের আওতায় ৫ লাখ সেনা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত ট্যাংক, কামান ও যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।

দেশটির সেনাবাহিনীর পাঁচ লাখ সদস্যকে ড্রোন ব্যবহারে দক্ষ করে ‘ড্রোন যোদ্ধা’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সিউল। শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক জানিয়েছেন, সামরিক বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা নিজেদের হাতে থাকা অস্ত্রের মতোই ড্রোন পরিচালনা করতে পারেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রায় পাঁচ লাখ সদস্যকে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।

যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিচ্ছে ড্রোন

প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত প্রমাণ করেছে যে ড্রোন এখন যুদ্ধের কৌশল বদলে দেওয়ার মতো প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘স্বল্প খরচের বিপুলসংখ্যক ড্রোন যুদ্ধের প্রকৃতিই বদলে দিচ্ছে।’

তাঁর মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ড্রোনের ব্যবহার আরও বাড়বে।

দক্ষিণ কোরিয়া মনে করছে, প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় শুধু বিশেষায়িত ইউনিট নয়, বরং সাধারণ সেনাসদস্যদেরও ড্রোন পরিচালনায় সক্ষম করে তোলা প্রয়োজন।

৬০ হাজার প্রশিক্ষণ ড্রোন সংগ্রহের পরিকল্পনা

নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ১১ হাজার বাণিজ্যিক ড্রোন সংগ্রহ করবে।

২০২৯ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৬০ হাজারে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ হাজারের বেশি স্বল্পমূল্যের একবার ব্যবহারযোগ্য যুদ্ধ ড্রোন সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ড্রোন শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করা, নজরদারি এবং প্রয়োজন হলে আঘাত হানার কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হবে।

নিজস্ব প্রযুক্তির দূরপাল্লার হামলাকারী ড্রোন

দক্ষিণ কোরিয়া দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দূরপাল্লার হামলাকারী ড্রোন ‘কে-লুকাস’ দ্রুত উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে।

এই ড্রোন ব্যবস্থার ধারণা নেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লুকাস ড্রোন থেকে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ওই ড্রোনের নকশায় ইরানের শাহেদ-১৩৬ ধরনের আত্মঘাতী ড্রোন প্রযুক্তির প্রভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া শাহেদ-১৩৬ ধরনের ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। কম খরচে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানোর কৌশল সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থায়ও জোর

শুধু আক্রমণাত্মক সক্ষমতা নয়, শত্রুর ড্রোন ঠেকানোর ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে চায় দক্ষিণ কোরিয়া।

এ জন্য লেজার অস্ত্র এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির মতো আধুনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সিউলের আশঙ্কা, উত্তর কোরিয়া ড্রোন প্রযুক্তিতে দ্রুত উন্নতি করছে। ফলে নিজেদের আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখতে নতুন প্রযুক্তি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

২০২২ সালের ড্রোন অনুপ্রবেশের শিক্ষা

উত্তর কোরিয়ার ড্রোন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার এই ঘোষণা এসেছে।

২০২২ সালে উত্তর কোরিয়ার পাঁচটি ছোট ড্রোন দক্ষিণ কোরিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। এর মধ্যে একটি ড্রোন রাজধানী সিউলে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের আশপাশের নিষিদ্ধ এলাকায়ও ঢুকে পড়ে।

ঘটনার পর দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী যুদ্ধবিমান ও আক্রমণকারী হেলিকপ্টার মোতায়েন করে। প্রায় ১০০টি গুলি ছোড়া হলেও কোনো ড্রোন ভূপাতিত করা সম্ভব হয়নি।

এই ঘটনা দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছিল।

উত্তর কোরিয়ার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতা বাড়ার ফলে পিয়ংইয়ংয়ের ড্রোন সক্ষমতাও উন্নত হচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত ড্রোন কৌশল এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা উত্তর কোরিয়াকে এমন সামরিক জ্ঞান দিচ্ছে, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অর্জন করতে তাদের অনেক বছর সময় লাগতে পারত।

উত্তর কোরিয়া ইতিমধ্যে হাজারো সেনা ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের জন্য পাঠিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে দেশটির সেনারা আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে।

ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাও চালিয়ে যাচ্ছে পিয়ংইয়ং

এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার ড্রোন পরিকল্পনার ঘোষণার দিনই উত্তর কোরিয়া জানিয়েছে, দেশটির নেতা কিম জং-উন কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত রকেট আর্টিলারি ব্যবস্থার পরীক্ষা তদারক করেছেন।

ফলে দুই কোরিয়ার মধ্যে সামরিক প্রতিযোগিতা শুধু প্রচলিত অস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রজন্মের যুদ্ধপ্রযুক্তিও এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার পাঁচ লাখ সেনাকে ড্রোন ব্যবহারে প্রশিক্ষিত করার পরিকল্পনা সেই পরিবর্তিত যুদ্ধ বাস্তবতারই প্রতিফলন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স