ঢাকা

গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারকে সহায়তায় বাজেটে বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হবে: মির্জা ফখরুল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটেই সহায়তার বরাদ্দ রাখার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধাদের মতো গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে।

শুক্রবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে ‘প্রতিকার ও পুনর্বাসনের অধিকার’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের যৌথ আয়োজক ছিল হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি) ও ‘মায়ের ডাক’।

মির্জা ফখরুল বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হচ্ছে, জুলাই যোদ্ধাদেরও ভাতা দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকেও সহায়তার আওতায় আনতে হবে।

তিনি বলেন, ‘বারবার বলেছি, যদি মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হয়, জুলাই যোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হয়, তাহলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে কেন ভাতা দেওয়া হবে না? অবশ্যই ভাতা দিতে হবে এবং সেটা আমরা এই বাজেটেই প্রভিশন রাখার ব্যবস্থা করব।’

‘ক্ষতি পূরণ করা যাবে না, তবে পাশে দাঁড়ানো যায়’

গুমের শিকার পরিবারগুলোর ক্ষতি কখনো পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, প্রিয়জন হারানোর কষ্ট কোনো আর্থিক সহায়তা দিয়ে মেটানো যায় না। তবে রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে এবং ভবিষ্যৎ জীবন গড়ে তুলতে সহযোগিতা করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগুলো পূরণ করা যাবে না। পাশে তো দাঁড়াতে পারি, সাহস দিতে পারি। ভবিষ্যৎ নির্মাণের ব্যবস্থা রাষ্ট্র করতে পারে।’

গুম, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সম্মিলিতভাবে প্রতিকারের আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা থাকবে।

গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ আখ্যা

গুমের ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের প্রকাশ্য বিচারের আওতায় আনা উচিত।

তিনি বলেন, ‘এটা মানবতাবিরোধী অপরাধ। প্রকাশ্যে এদের বিচার হওয়া উচিত, শাস্তি হওয়া উচিত।’

সাবেক সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ক্ষমতার সময়ে যারা অহংকার ও দাম্ভিকতা দেখিয়েছেন, তাদেরও একদিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিশ্বাস করি, একে একে প্রত্যেকে ধরা পড়বে, প্রত্যেকের বিচার হবে।’

গুমের বিচার নিয়ে রাজনীতি নয়: মির্জা ফখরুল

গুম ও নির্যাতনের ঘটনাকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, এটি মানবিক ও ন্যায়বিচারের বিষয়।

তিনি বলেন, ‘গুম হওয়া, অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হওয়া—এগুলো নিয়ে রাজনীতি করতে চাই না। এ ব্যাপারে আমরা সবাই এক। আমরা বিচার চাই। তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চাই। তাঁদের স্বীকৃতি চাই। আইনের যে শক্তি, সেই শক্তি তাঁদের হাতে তুলে দিতে চাই।’

‘মায়ের ডাক’-এর আন্দোলনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, যখন অনেকে কথা বলার সাহস পাননি, তখন সংগঠনটির সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

‘এক যুগের বেশি সময় বাবাকে দেখিনি’

সংলাপে নিজের বেদনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর গুম হওয়া চালক কাওসার হোসেনের মেয়ে লামিয়া আক্তার মীম।

তিনি বলেন, বাবা জীবিত আছেন নাকি মারা গেছেন—এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেই এক যুগের বেশি সময় পার করেছেন তিনি।

লামিয়া বলেন, ‘আমার বাবাকে এবং আদনান চাচ্চুকে রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এক যুগেরও বেশি হয়ে গেছে, আমি আমার বাবাকে দেখিনি। আমার বাবাকে যখন নিয়ে গেছে, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র তিন বছর।’

বাবার সঙ্গে স্মৃতি বলতে তেমন কিছু নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছোটবেলায় বাবাকে দেখার সুযোগও খুব কম হয়েছে। বাবার সঙ্গে তোলা একটি ছবি ছাড়া তাঁর কাছে আর কোনো স্মৃতি নেই।

‘আয়নাঘরের সেল ছিল কবর সেলের মতো’

২০২৫ সালের ৫ জুন ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লামিয়া বলেন, সেখানে থাকা প্রতিটি সেলের পরিবেশ ছিল ভয়াবহ।

তিনি বলেন, ‘ওই সেলগুলোর নামই ছিল কবর সেল, যেখানে একজন সুস্থ মানুষ পাঁচ মিনিট থাকলে সে–ও অসুস্থ হয়ে যাবে।’

লামিয়ার অভিযোগ, তাঁর বাবা ও অন্য ভুক্তভোগীরা সেখানে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এবং বছরের পর বছর বন্দি ছিলেন। সেখানে কী ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন—এসবের বিচার দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমি শুধু বিচার চেয়েছিলাম। আমি আমার বাবাকে ফেরত চেয়েছিলাম। ওরা আমার বাবাকে ফিরিয়ে দেয়নি।’

বাবার মরদেহ না পাওয়ার কষ্ট তুলে ধরে লামিয়া বলেন, অন্তত একটি কবর থাকলে সেখানে দাঁড়িয়ে বাবাকে স্মরণ করতে পারতেন। কিন্তু সেই সুযোগও তাঁর নেই।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর তিন দাবি

ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম সংলাপে বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছে। তাদের আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে—সে প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে দিতে হবে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ‘মায়ের ডাক’-এর অনুষ্ঠানগুলো গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের জন্য এক ধরনের আশ্রয়ের জায়গা হয়ে উঠেছিল, যেখানে তারা নিজেদের কষ্ট ভাগ করে নিতে পারতেন।

মীর আহমাদ বিন কাসেম গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারগুলোর তিনটি প্রধান দাবির কথা তুলে ধরেন।

এর মধ্যে রয়েছে—

গুমের ঘটনায় জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি;
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ;
ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা বন্ধে কার্যকর আইন ও ব্যবস্থা গ্রহণ।

তিনি বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে তাদের যেন অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে অন্যের ওপর নির্ভর করতে না হয়, সেই দায়িত্ব রাষ্ট্র নিতে পারে।

মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জুলাই জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি ফ্যাসিবাদ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস জানার একটি শিক্ষাকেন্দ্র হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এই বাংলার মাটিতে আমরা আর কোনো দিন কোনো ফ্যাসিবাদের কার্যক্রম ফিরে আসতে দেব না।’

ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিখোঁজদের সন্ধানের দাবি

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, অতীতে বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে ভেসে আসা গুলিবিদ্ধ লাশগুলোর সঙ্গে গুম হওয়া ব্যক্তিদের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, উদ্ধার করা মরদেহের সংরক্ষিত ডিএনএ নমুনা এবং এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে মিলিয়ে দেখা উচিত।

সংলাপে স্বাগত বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম। অনুষ্ঠানে ‘সাপোর্ট লাইফ আফটার টর্চার’ শীর্ষক অবস্থানপত্র উপস্থাপন করেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনার অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামসহ আইনপ্রণেতা, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং গুম-নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যরা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স