পণ্যবাহী জাহাজে ইরানি ড্রোন হামলার অভিযোগের এক দিনের মাথায় ইরানে পাল্টা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কমান্ড ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাব হিসেবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনা এবং উপকূলীয় রাডার স্টেশনে হামলা চালানো হয়েছে।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, ‘গতকালের (বৃহস্পতিবার) হামলার কড়া জবাব’ দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থার ওপর আঘাত হেনেছে।
সেন্টকম আরও অভিযোগ করেছে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে ইরানের এমন কর্মকাণ্ড নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।
এই ঘোষণার পর ইরানের সিরিক বন্দরের কাছে মার্কিন হামলার খবর পাওয়া যায়।
এভার লাভলি জাহাজে হামলার অভিযোগ
এর আগে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ এভার লাভলিতে হামলার ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারকের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প বলেন, এই হামলা ছিল ‘বোকামিপূর্ণ’ এবং এর জন্য ইরান দায়ী।
তার দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর দিকে ইরান অন্তত চারটি একমুখী হামলাকারী ড্রোন (ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন) ছুড়েছে। এর মধ্যে তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করা হলেও একটি ড্রোন জাহাজে আঘাত হানে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ড্রোনের একটি আঘাতে একটি বড় ও ব্যয়বহুল পণ্যবাহী জাহাজের ওপরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে হামলায় জাহাজের কোনো নাবিক বা কর্মী আহত হননি। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও জাহাজটি তার যাত্রা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়।
১৭ জুনের সমঝোতা নিয়ে নতুন সংকট
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৭ জুন একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল সামরিক উত্তেজনা কমানো। ওই সমঝোতায় লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
এই সমঝোতার মাধ্যমে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু হওয়া যুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত হয়।
তবে এটি কোনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি ছিল না। বরং ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বৈশ্বিক উদ্বেগ
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও পণ্য পরিবহন হয়।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, সার ও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যায়।
১৭ জুনের সমঝোতা অনুযায়ী, ৬০ দিনের একটি সময়সীমার মধ্যে কোনো ধরনের মাশুল ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
কিন্তু যুদ্ধবিরতির পরিবেশ খুব বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে লেবাননে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার প্রতিবাদ জানায় ইরান।
এরপর ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দেয়।
যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা
বৃহস্পতিবার ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় এভার লাভলি জাহাজে একটি বস্তু আঘাত হানে।
ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানকে দায়ী করে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, জাহাজে হামলার ঘটনা তিনি পছন্দ করেননি এবং এর পরিণতি শিগগির দেখা যাবে।
তিনি বলেন, ‘জাহাজটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের এমনটা করা উচিত হয়নি।’
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা
এভার লাভলি জাহাজে হামলা এবং এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা শুধু আঞ্চলিক রাজনীতির বিষয় নয়; বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা যে কতটা ভঙ্গুর, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তা আবারও সামনে এনেছে। নতুন করে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে জ্বালানি বাজার, নৌ চলাচল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।