ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে দাঁড়িয়েছে। এক শতকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশটির অন্যতম ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন, ধসে পড়েছে শত শত ভবন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে ধীরগতির অভিযোগে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
শুক্রবার দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৯২০ জনে পৌঁছানোর তথ্য জানান। তিনি ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের ভাই।
এর আগে দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছিলেন, ভূমিকম্পে প্রায় তিন হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। শুক্রবার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি লা গুয়ারা রাজ্য পরিদর্শন করে তিনি জানান, বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো সেখানে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
একের পর এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিপর্যয়
স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্প দুটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫।
ভূমিকম্পের প্রভাবে রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু ভবন ধসে পড়ে। আধুনিক ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে এটিকে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
১৯৬৭ সালে দেশটিতে সর্বশেষ বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছিল। ওই ঘটনায় ২৪০ জন নিহত হন।
কারাকাসের সাংবাদিক নিকোল কোলস্টার ভূমিকম্পের ভয়াবহতা বর্ণনা করে বলেন, ‘জীবনে এত শক্তিশালী ভূমিকম্প কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল, পুরো ভবন আমার ওপর ভেঙে পড়বে।’
নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা
ইউএসজিএস আশঙ্কা করছে, এই ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকাতেও বড় ধরনের সংখ্যা দেখা যাচ্ছে।
সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সম্ভাব্য মৃতের সংখ্যা প্রকাশ না করলেও নিখোঁজদের জন্য চালু করা একটি ওয়েবসাইটে প্রায় ৪৯ হাজার ৬০০ জনের নাম যুক্ত হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, ভূমিকম্পের প্রভাব ভেনেজুয়েলার প্রায় ৭০ লাখ মানুষের ওপর পড়তে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৫০টি ভবন ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আটটি হাসপাতাল, রেডক্রস ভবন এবং ফরাসি দূতাবাসের ভবন।
ধ্বংসস্তূপের নিচে উদ্ধারের অপেক্ষায় মানুষ
ভূমিকম্পের পর বৃহস্পতিবার রাতেও বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মানুষের আর্তনাদ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা।
উদ্ধারকাজে নেমেছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, সেনাসদস্য ও সাধারণ মানুষ। অনেক জায়গায় আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে খালি হাতেই উদ্ধারকাজ চালাতে দেখা গেছে।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন এলাকায় মশাল ও অস্থায়ী আলো ব্যবহার করে রাতভর কাজ করেছেন উদ্ধারকারীরা।
উপকূলীয় শহর লা গুয়ারার বাসিন্দা হুয়ান অর্তিজ বলেন, তাঁর এক বন্ধু মারা গেছেন এবং আরেকজন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছেন। তাঁর পরিচিত প্রায় ২০ জনের এখনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
কারাকাসের অধীন চাকাও এলাকার মেয়র গুস্তাভো দুকে বলেন, উদ্ধারকারীরা এখনো আশা করছেন, অনেক মানুষ জীবিত অবস্থায় আটকে থাকতে পারেন। তাই যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
ঘর হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে হাজারো মানুষ
ভূমিকম্পে বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন।
লা গুয়ারার বাসিন্দা ৬৪ বছর বয়সী পেদ্রো পেরেজের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে এখন রাস্তায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
উপকূলীয় মোরন শহরেও একই পরিস্থিতি। সেখানে বিদ্যুৎ ও পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
তবে সংকটের মধ্যেও এগিয়ে এসেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। লা গুয়ারায় তাঁরা খাবার, পানি ও ওষুধ নিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
রয়টার্সের সাংবাদিকেরা উদ্ধারকাজে সরকারপন্থী মোটরসাইকেল সংগঠন ‘কোলেকতিভো’-এর সদস্যদেরও অংশ নিতে দেখেছেন। রাজনৈতিক বিরোধীদের হয়রানির অভিযোগ থাকা এই গোষ্ঠী দুর্যোগের সময় উদ্ধারকাজে যুক্ত হয়েছে।
ধীরগতির উদ্ধারকাজ নিয়ে ক্ষোভ
উদ্ধারকাজের ধীরগতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক ভুক্তভোগী।
লা গুয়ারার ৩৩ বছর বয়সী প্যারামেডিক রত্নি বোম্বার্ট পাঁচ ঘণ্টা ধরে ওপিপি ৩৩ নামের একটি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে তাঁর মাকে খুঁজেছেন।
তিনি বলেন, ১৫ তলা ভবনটি এখন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। শুরুতে কোনো সরকারি উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছায়নি। বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারাই খালি হাতে উদ্ধারকাজ শুরু করেন।
রত্নি বোম্বার্ট বলেন, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বিচ্ছিন্ন দেহ এবং শিশুদের মৃতদেহ দেখার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
উদ্ধারকারী দিয়েগো গঞ্জালেস জানান, কাটিয়া লা মার শহরের একটি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে চার ঘণ্টার চেষ্টায় তিনি তাঁর ৩৪ বছর বয়সী কাজিন হিলারি রদ্রিগেজকে উদ্ধার করেন।
তিনি বলেন, শহরটির বেশির ভাগ ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে এবং উদ্ধারকাজে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাতে শুরু
ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলাকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, স্পেন, ফ্রান্স, তুরস্ক, কাতারসহ বিভিন্ন দেশ।
উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ত্রাণসামগ্রী ও পরিবহন সহায়তা পাঠানো হচ্ছে।
মেক্সিকোর সেনাবাহিনীর সদস্যরা ইতিমধ্যে কারাকাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ১৫ কোটি ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ভয়াবহ এই দুর্যোগে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সহায়তা ও মানবিক ত্রাণ পাঠাচ্ছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সম্পর্ক
চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের নেতা নিকোলা মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর দেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এরপর ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে। ভূমিকম্পের পর যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার আশ্বাসের জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন দেলসি রদ্রিগেজ। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় করছে জাতিসংঘ।
তিনি বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যাপক আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন হবে। কারণ ভূমিকম্পের আগেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের কারণে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ৮০ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
ভয়াবহ এই ভূমিকম্পের পর এখন দেশটির প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্রুত উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন।