পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতাল পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের (পিমস) মাতৃসদনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার ভোরে হাসপাতালের তৃতীয় তলার মাতৃসদন ইউনিটে আগুন ছড়িয়ে পড়লে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
আগুনের সূত্রপাত ওই ইউনিটের একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) থেকে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। যে কক্ষে আগুন লাগে, সেখানে তখন ১৫টি নবজাতক ছিল। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে মাত্র একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
ঘটনার পর নিহত শিশুদের স্বজনদের অভিযোগ, আগুন লাগার পর উদ্ধার তৎপরতা শুরু হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, মাতৃসদনের দরজা তালাবদ্ধ ছিল এবং সাধারণ মানুষকে দরজা ভেঙে শিশুদের উদ্ধারের চেষ্টা করতে হয়েছে।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ওয়ার্ডের দরজা তালাবদ্ধ ছিল না; সেখানে নিরাপত্তার জন্য পাহারাদার রাখা হয়েছিল। ফলে আগুনের সূত্রপাত, উদ্ধার তৎপরতায় বিলম্ব এবং ওয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে এখন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে।
ভোরের আগুন, মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক
বুধবার ভোরে পিমসের মাতৃসদন ইউনিটে আগুন লাগার সময় হাসপাতালের ওই অংশে সদ্যোজাত শিশু ও প্রসূতিদের স্বজনেরা ছিলেন।
হিবসা ওয়ালিদ নামে এক নারী ওই কক্ষের কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন। তাঁর ভাবি কয়েক দিন আগে সেখানে সন্তান প্রসব করেছিলেন। হিবসা জানান, প্রথমে তিনি কারও চিৎকার শুনে ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো রোগীর মৃত্যু হয়েছে। কিছুক্ষণ পর তিনি ধোঁয়া দেখতে পান।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে তিনি আরেকজনের সঙ্গে দ্রুত একটি নবজাতককে নিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে যান। শিশুটির বয়স এতই কম ছিল যে তখনও তার নাম রাখা হয়নি।
হিবসা বলেন, তখন তাঁরা নিজেদের কোনো জিনিসপত্রের কথা ভাবেননি। শুধু শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসার চেষ্টা করেছিলেন।
তাঁর ভাষায়, কিছু রোগী ওই রাতেই সন্তান প্রসব করেছিলেন। আতঙ্কের মধ্যে কীভাবে তাঁরা নিচে নেমে এসেছিলেন, সেটিও তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল।
‘আমার মেয়ের বয়স ছিল মাত্র তিন দিন’
আগুনে সন্তান হারানো স্বজনদের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে ভয়াবহতার চিত্র।
৪০ বছর বয়সী খুররম মেহমুদ এএফপিকে বলেন, তিনি তাঁর তিন দিনের মেয়েকে হারিয়েছেন। উদ্ধারকারীদের জন্য তাঁকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্য এক নিহত শিশুর মা জাওয়েরিয়া অভিযোগ করেন, মাতৃসদনের দরজা তালাবদ্ধ ছিল। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কাঁদছিলেন ও সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন।
তাঁর দাবি, প্রায় চার ঘণ্টা পর পুলিশ এসে জানায়, তারা তদন্ত করতে এসেছে।
ক্ষুব্ধ এই মা প্রশ্ন তোলেন, চিকিৎসকেরা কেন শিশুদের সেখানে রেখে চলে গেলেন। তাঁর অভিযোগ, আগুনের মধ্যে আটকা পড়া শিশুদের উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্বজনদের এমন অভিযোগের ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—আগুন লাগার পর হাসপাতালের কর্মীরা কত দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন এবং নবজাতকদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য কী ধরনের জরুরি ব্যবস্থা ছিল।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন
তবে পিমসের নির্বাহী পরিচালক রানা ইমরান সিকান্দার বিবিসিকে বলেছেন, মাতৃসদনের দরজা তালাবদ্ধ ছিল না। সেখানে নিরাপত্তার জন্য পাহারাদার ছিলেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা, সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতীতে নবজাতক চুরির ঘটনা ঘটেছে। সে কারণেই শিশুদের নিরাপত্তার জন্য প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়।
কিন্তু স্বজনদের অভিযোগ, এই নিরাপত্তাব্যবস্থা জরুরি পরিস্থিতিতে শিশুদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি করেছে।
একজন বাবা রয়টার্সকে জানান, তিনি আগুন লাগার আগে প্রায় আট দিন ধরে ওই ওয়ার্ডে যাতায়াত করছিলেন। তাঁর দাবি, ভবনটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না এবং জরুরি অবস্থায় বের হওয়ার জন্যও সঠিক ব্যবস্থা ছিল না।
তিনি বলেন, বেশির ভাগ দরজা বন্ধ থাকত। শিশুদের দেখতে আসা মানুষের কারণে কেবল একটি দরজা খোলা রাখা হতো বলে তাঁর দাবি।
এই বক্তব্য সত্য হলে, শিশু চুরি ঠেকাতে নেওয়া নিরাপত্তাব্যবস্থা অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছিল কি না, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
‘সাধারণ মানুষকে দরজা ভাঙতে হয়েছে’
ঘটনার সময় হাসপাতালের ভেতরে ছিলেন এমন কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী আরও গুরুতর অভিযোগ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী এএফপিকে বলেন, আগুনের সময় সাধারণ মানুষকে দরজা ভাঙতে হয়েছিল। আগুন নিয়ন্ত্রণ ও ভেতরে প্রবেশের জন্য উদ্ধারকারীদের জানালাও ভাঙতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
আবদুল গফুর নামে আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, রোগীদের বাঁচাতে তিনি নিজেও ভবনে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মাতৃসদন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি।
তাঁর বর্ণনায়, ভবনের ভেতরে ঘন কালো ধোঁয়া ছিল এবং রোগীরা আটকা পড়েছিলেন। উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় নিয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যের পার্থক্য রয়েছে।
ইসলামাবাদের চিফ কমিশনার সোহেল আশরাফ এএফপিকে জানিয়েছেন, জরুরি ফোন পাওয়ার পরপরই উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল।
ফলে উদ্ধারকারী দলের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রকৃতপক্ষে কত সময় লেগেছিল এবং সেখানে পৌঁছানোর পর নবজাতকদের উদ্ধারে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—তদন্তে এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে।
একটি কক্ষে ছিল ১৫ নবজাতক
পিমসের মাতৃসদন ইউনিটের তৃতীয় তলায় একটি কক্ষে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একটি এসি যন্ত্র থেকেই আগুনের সূত্রপাত।
সেই কক্ষে তখন ১৫টি নবজাতক ছিল। আগুনের ভয়াবহতায় তাদের মধ্যে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। কেবল একজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
এ ধরনের একটি ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। নবজাতকেরা নিজেরা চলাফেরা বা আগুন থেকে বের হয়ে আসতে পারে না। ফলে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সম্পূর্ণ দায়িত্ব হাসপাতালের কর্মী ও উদ্ধারকারীদের ওপর থাকে।
এই কারণে নবজাতকদের জন্য নির্ধারিত ইউনিটে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমনপথ, আগুন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং দ্রুত উদ্ধার পরিকল্পনা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বজনদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
পিমসের মা ও শিশু ইউনিটে ১৫৬ শয্যা
পাকিস্তানের রাজধানীর অন্যতম বড় সরকারি হাসপাতাল পিমস। হাসপাতালটির মা ও শিশু স্বাস্থ্য ইউনিটে মোট ১৫৬টি শয্যা রয়েছে।
ফলে এখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক প্রসূতি, নবজাতক ও তাঁদের স্বজনের উপস্থিতি থাকে। এমন একটি বড় সরকারি হাসপাতালে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো দুর্বলতা থাকলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এবারের ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে নবজাতক ইউনিটে আগুনের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য আলাদা জরুরি পরিকল্পনা ছিল কি না, কর্মীরা নিয়মিত মহড়া বা প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন কি না এবং আগুন লাগার পর শিশুদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন তদন্তের কেন্দ্রে থাকবে।
পাকিস্তানে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে পুরোনো সংকট
পিমসের অগ্নিকাণ্ড বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে একাধিক বড় অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
দেশটিতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের পর প্রায়ই দুর্বল অগ্নিনিরাপত্তা আইন, ভবন নির্মাণ বিধি লঙ্ঘন এবং বিদ্যমান বিধিনিষেধ যথাযথভাবে প্রয়োগ না করার অভিযোগ সামনে আসে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে করাচির একটি শপিং মলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন। সেই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরাও অভিযোগ করেছিলেন, জরুরি বহির্গমনপথ তালাবদ্ধ থাকায় অনেক মানুষ ভবন থেকে বের হতে পারেননি।
পিমসের ঘটনায়ও যদি জরুরি দরজা বন্ধ থাকা বা বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি পাকিস্তানের হাসপাতাল ও অন্যান্য জনসমাগমস্থলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় দুর্বলতাকে আবার সামনে নিয়ে আসবে।
প্রধানমন্ত্রী তদন্তের নির্দেশ, বরখাস্ত দুই শীর্ষ কর্মকর্তা
ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব আসলাম ঘৌরিকেও বরখাস্ত করা হয়েছে।
সরকারি বিবৃতিতে ঘটনাটিকে শিশুদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে এখন আগুনের প্রকৃত কারণের পাশাপাশি হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমনপথ, দরজা খোলা বা বন্ধ থাকার বিষয়, দায়িত্বরত কর্মীদের উপস্থিতি এবং উদ্ধার তৎপরতায় কোনো ধরনের বিলম্ব হয়েছিল কি না—সবকিছুই খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
শোকের পাশাপাশি জবাবদিহির প্রশ্ন
১৪টি নবজাতকের মৃত্যু শুধু একটি অগ্নিকাণ্ডের প্রাণহানি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাসপাতালের নিরাপত্তা ও জরুরি সেবাব্যবস্থার প্রশ্ন।
স্বজনদের অভিযোগ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে দরজা তালাবদ্ধ ছিল কি না, উদ্ধারকারী দল কখন পৌঁছেছিল এবং আগুন লাগার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা কোথায় ছিলেন—এই তিনটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া জরুরি।
কারণ নবজাতকেরা নিজেরা কোনো বিপদ থেকে পালাতে পারে না। তাদের নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তদন্ত শুরু হলে সেই তদন্তে শুধু আগুনের উৎস শনাক্ত করাই যথেষ্ট হবে না। ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে হাসপাতালের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমনপথ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং শিশু নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল, সেটিও চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
১৪টি পরিবারের কাছে হারানো সন্তান আর ফিরে আসবে না। তবে এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণ করা গেলে অন্তত ভবিষ্যতে কোনো হাসপাতালের নবজাতক ইউনিট যেন এমন মৃত্যুফাঁদে পরিণত না হয়, সেই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।