ঢাকা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিশোরদের আসক্তির মামলা, মেটার ১৭ বিলিয়ন ডলারের রফা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুক্তরাষ্ট্রের কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে করা এক ঐতিহাসিক মামলার নিষ্পত্তিতে ১৭ বিলিয়ন ডলার দিতে রাজি হয়েছে মেটা। অর্থের পাশাপাশি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে শিশু-কিশোরদের সুরক্ষায় একাধিক নতুন ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি।

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭টি অঙ্গরাজ্যের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই সমঝোতায় পৌঁছেছে মেটা। বুধবার অঙ্গরাজ্যগুলোর অ্যাটর্নি জেনারেলরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানান।

মামলাটিতে অভিযোগ করা হয়েছিল, কিশোর-কিশোরীদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে মেটা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু ফিচার ও নকশা তৈরি করেছে, যা ব্যবহারকারীদের মধ্যে আসক্তি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এসব নকশার সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটি জনগণকে যথেষ্ট তথ্য দেয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়।

এই সমঝোতার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালতে চলমান বিচার সংক্ষিপ্ত হয়ে গেল। বিচার গড়ালে মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে আদালতে সাক্ষ্য দিতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

৪৭ অঙ্গরাজ্যের অভিযোগ

কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে মেটার বিরুদ্ধে প্রথম বড় পরিসরের মামলা হয় ২০২৩ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে। এসব অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সিও ছিল।

পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্য এই আইনি লড়াইয়ে যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে ৪৭টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে।

অভিযোগের অন্যতম বিষয় ছিল, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে শিশু-কিশোরেরা বারবার এসব প্ল্যাটফর্মে ফিরে আসে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করে। এতে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও মামলায় দাবি করা হয়।

এ ছাড়া ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের বাবা-মায়ের সম্মতি ছাড়াই ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের অভিযোগও আনা হয় মেটার বিরুদ্ধে। মামলাকারীদের ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তা সুরক্ষার আইন লঙ্ঘনের শামিল।

তবে মেটা এসব অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে আসছিল এবং শিশু ও কিশোরদের জন্য নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ তৈরিতে তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে দাবি করেছে।

ভার্জিনিয়াই পাবে ৩৫৩ মিলিয়ন ডলার

সমঝোতার পর অঙ্গরাজ্যগুলো বিপুল অঙ্কের অর্থ পাবে। অ্যাটর্নি জেনারেল জে জোনস বলেন, শুধু ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যই ৩৫৩ মিলিয়ন ডলার পাবে।

তিনি এটিকে অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোক্তা অধিকার রক্ষার ইতিহাসে অন্যতম বড় সমঝোতা হিসেবে বর্ণনা করেন।

জোনস অভিযোগ করেন, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আসক্তিকর নকশা নিয়ে মেটা বছরের পর বছর জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সমঝোতার মাধ্যমে এসব ক্ষতিকর চর্চা বন্ধ করার পাশাপাশি শিশুদের অনলাইনের ক্ষতিকর দিক থেকে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে মেটা এক ব্লগ পোস্টে জানিয়েছে, বাবা-মাকে আরও কার্যকরভাবে সন্তানদের অনলাইন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সহায়তা এবং কিশোরদের নিরাপদ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। নতুন সমঝোতার মাধ্যমে সেই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা হবে।

মেটার আয়ের তুলনায় অর্থের পরিমাণ কতটা

১৭ বিলিয়ন ডলার শুনতে বিপুল অর্থ মনে হলেও মেটার ব্যবসার আকারের তুলনায় এটি তুলনামূলকভাবে ছোট।

২০২৫ সালে মেটার মোট আয় ছিল প্রায় ২০১ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে ১৭ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতার অর্থ প্রতিষ্ঠানটির এক বছরের মোট আয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হলেও কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার জন্য তা অস্তিত্বগত চাপ তৈরি করার মতো নয়।

তবে অর্থের পরিমাণের চেয়েও এই সমঝোতার গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এর মাধ্যমে শিশু ও কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশা ও ব্যবহারের নিয়মে পরিবর্তন আনার বিষয়ে মেটাকে বেশ কিছু নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে।

বিচার শুরুর পরই সমঝোতা

মেটার বিরুদ্ধে মামলার বিচার প্রক্রিয়াও ইতিমধ্যে শুরু হয়েছিল।

গত সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে মামলাটির বিচার শুরু হয়। ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ ইওভন গঞ্জালেস রজার্স এই বিচার পরিচালনা করছিলেন।

ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি মঙ্গলবার দিনের শেষ দিকে আদালতে জবানবন্দি দেওয়া শুরু করেন। সেখানে তিনি শিশুদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষায় মেটার অতীত কর্মকাণ্ড এবং সাম্প্রতিক অগ্রগতির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

এরপর অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের মামলাগুলোর বিচারও শুরু হওয়ার কথা ছিল। এ ছাড়া আরও নয়জন অ্যাটর্নি জেনারেল নিজ নিজ অঙ্গরাজ্যে মেটার বিরুদ্ধে আলাদা মামলা করেছিলেন।

এই পরিস্থিতিতে বড় পরিসরের আইনি লড়াই দীর্ঘায়িত হওয়ার আগেই সমঝোতার পথ বেছে নিল মেটা।

শিশুদের জন্য কী পরিবর্তন আনবে মেটা

সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে কিশোর-কিশোরীদের জন্য নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করা।

প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, মেটা শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণে দৈনিক কঠোর সময়সীমা বা ‘হার্ড ক্যাপ’ চালু করবে। ব্যবহারের মধ্যে বিরতি নেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হবে।

এর ফলে একজন কিশোর কতক্ষণ একটানা বা দিনে মোট কত সময় প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে, সেটি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ আরও শক্তিশালী হবে।

এ ছাড়া স্কুল চলাকালে সপ্তাহের নির্দিষ্ট সময়ে পুশ নোটিফিকেশন বন্ধ করার ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর উদ্দেশ্য হবে পড়াশোনার সময় বারবার ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে মনোযোগ চলে যাওয়া কমানো।

ক্ষতিকর কনটেন্ট ঠেকাতে বয়স যাচাই

সমঝোতায় বয়স যাচাই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও রয়েছে।

মেটা বুলিং, খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধি এবং নিজের ক্ষতি করার মতো ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে শিশু-কিশোরদের সুরক্ষায় আরও শক্তিশালী বয়স-নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা চালু করতে রাজি হয়েছে।

একই সঙ্গে ব্যবহারকারীর বয়স অনুযায়ী উপযুক্ত কনটেন্ট প্রদর্শন ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও আরও উন্নত করা হবে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিশোরদের জন্য অনুপযুক্ত কনটেন্ট সহজে পৌঁছে যাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিভাবক, শিক্ষক ও শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর উদ্বেগ রয়েছে।

অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণ আরও সহজ হবে

সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্যারেন্টাল কন্ট্রোল বা অভিভাবকদের নজরদারির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

নতুন ব্যবস্থায় বাবা-মায়েরা সন্তানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময়, কনটেন্ট এবং অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ও সহজ সরঞ্জাম পাবেন।

সামাজিক তুলনা বাড়াতে পারে—এমন ফিচারগুলোর ওপরও সীমাবদ্ধতা আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ‘লাইক’ সংখ্যার মতো সামাজিক তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের একটি বিষয় হলো, কিশোর-কিশোরীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করতে গিয়ে আত্মসম্মান, মানসিক চাপ ও শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণার মধ্যে পড়তে পারে। নতুন বিধিনিষেধের মাধ্যমে এ ধরনের চাপ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হবে।

শুধু জরিমানা নয়, নকশাতেও পরিবর্তনের চাপ

মেটার সঙ্গে এই সমঝোতার তাৎপর্য শুধু ১৭ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেল ও পণ্য নকশার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

এত দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ ছিল—ব্যবহারকারী যত বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে থাকবেন, বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় তত বাড়বে। ফলে ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন ফিচার তৈরির প্রবণতা তৈরি হয়।

কিশোরদের ক্ষেত্রে এই নকশা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেশি। কারণ বয়স কম হওয়ায় তারা অতিরিক্ত ব্যবহারের ঝুঁকি, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং অনলাইন সামাজিক চাপের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

মেটার ওপর নতুন বিধিনিষেধ তাই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে—শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার ব্যবসায়িক কৌশলের পাশাপাশি নিরাপত্তাকেও নকশার কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে।

অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিও আহ্বান

মেটা জানিয়েছে, শিশুদের সুরক্ষায় তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোরও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

অর্থাৎ বিষয়টি শুধু ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রযুক্তি খাতের সামগ্রিক নীতিমালা ও ব্যবসায়িক পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই সমঝোতা একই সঙ্গে অঙ্গরাজ্য সরকারগুলোর পক্ষ থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষায় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তারা আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন নজির তৈরি হলো।

ফলে ১৭ বিলিয়ন ডলারের এই সমঝোতা শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়; যুক্তরাষ্ট্রে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ভবিষ্যৎ নীতি, প্রযুক্তি কোম্পানির দায়বদ্ধতা এবং অনলাইন নিরাপত্তার কাঠামোতেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স