বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি কর্মরত, যাঁদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। তবে সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ শ্রম রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি হলেও দক্ষতার ঘাটতির কারণে এই বিপুল জনশক্তির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তাই কারিগরি শিক্ষার নতুন ব্র্যান্ডিং, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং শিল্পখাতের চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি বলে মত দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হক।
তিনি বলেন, ব্রাজিল প্রতিবছর হাতে গোনা কয়েক হাজার ফুটবলার বিদেশে পাঠালেও তাঁদের মাধ্যমে যে বৈদেশিক আয় সৃষ্টি হয়, তা মাথাপিছু হিসাবে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিকের আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি লিগে খেলা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের ট্রান্সফার ফি, বেতন ও ইমেজ রাইটস মিলিয়ে এই খাতের অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি মানুষ বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেলেও ২০২৫ সালে দেশের মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ২৮০ কোটি ডলার।
তার মতে, এই বৈষম্যের কারণ প্রতিভার অভাব নয়; বরং দক্ষ মানবসম্পদকে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী ‘প্রোডাক্ট’ হিসেবে গড়ে তুলতে না পারা।
দক্ষতার ঘাটতিই কমিয়ে দিচ্ছে রেমিট্যান্স
অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া বাংলাদেশিদের প্রায় ৪৩ শতাংশ স্বল্পদক্ষ এবং ৩৪ শতাংশ আধা-দক্ষ। অর্থাৎ, মোট কর্মীর বড় অংশই আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের নিম্ন দক্ষতার স্তরে অবস্থান করছেন।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রেমিট্যান্সে। একজন বাংলাদেশি প্রবাসী যেখানে গড়ে মাসে ২০৩ ডলার দেশে পাঠান, সেখানে একজন ফিলিপিনো কর্মী গড়ে ৫৬৪ ডলার পাঠান। একই ধরনের শ্রমবাজারে কাজ করেও এই বিশাল ব্যবধানের মূল কারণ হলো দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সনদের অভাব।
তিনি বলেন, একজন পেশাদার ফুটবলার বিদেশে যাওয়ার আগে বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ নেন, নানা পর্যায়ের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেন। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ শ্রমিক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা দক্ষতার স্বীকৃতি ছাড়াই বিদেশে পাড়ি জমান।
নির্বাচনী অঙ্গীকার থেকে বাস্তব উদ্যোগ
লেখকের মতে, ইতিবাচক দিক হলো সরকার এখন এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাধ্যমিক স্তর থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথা জানান। পাশাপাশি জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর এবং তৃতীয় ভাষা শেখানোর বিষয়টিও নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় কারিগরি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ১২ হাজার কলেজশিক্ষককে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল এবং প্রতিটি জেলায় পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।
লেখকের মতে, কোনো সরকার যদি ক্ষমতায় আসার আগেই একটি বিষয়কে নির্বাচনী অঙ্গীকারে স্থান দেয়, তাহলে সেটি যে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অগ্রাধিকার, তা স্পষ্ট হয়। তবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এসব পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।
শুধু বাধ্যতামূলক করলেই হবে না
তিনি বলেন, শুধু কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। এর জন্য অন্তত তিনটি মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথমত, এমন একটি সনদব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা দেশি ও বিদেশি নিয়োগদাতাদের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য।
দ্বিতীয়ত, এমন একটি পাঠ্যক্রম প্রয়োজন, যা সরাসরি শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। শুধুমাত্র তাত্ত্বিক বা কাগজে-কলমে তৈরি সিলেবাস দিয়ে দক্ষ কর্মী তৈরি সম্ভব নয়।
তৃতীয়ত, কারিগরি শিক্ষার এমন একটি ইতিবাচক পরিচয় বা ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে, যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে সম্মানজনক হিসেবে বিবেচিত হবে।
বদলাতে হবে কারিগরি শিক্ষার সামাজিক ভাবমূর্তি
অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক বলেন, বাংলাদেশের সমাজে ‘কারিগরি শিক্ষা’ শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে একটি নেতিবাচক ধারণা বহন করে আসছে। অনেক অভিভাবক এখনো মনে করেন, ভালো শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষা গ্রহণ করে, আর অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীরাই কারিগরি শিক্ষায় যায়।
কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একই ধরনের কারিগরি দক্ষতা একজন বাংলাদেশিকে জাপানে কেয়ারগিভার হিসেবে কিংবা সৌদি আরবে ওয়েল্ডার হিসেবে উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ এনে দিতে পারে। ফলে সমস্যা দক্ষতার নয়; বরং সমাজে সেই দক্ষতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তিনি উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার কথা উল্লেখ করেন। দেশটি ‘ভোকেশনাল স্কুল’ শব্দটি পরিহার করে ‘মাইস্টার হাইস্কুল’ নাম চালু করেছে, যেখানে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বিকল্প নয়, বরং উৎকর্ষের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশেও ‘কারিগরি শিক্ষা’ নামের পরিবর্তে ‘স্কিলস অ্যান্ড প্রফেশনাল এডুকেশন’ বা ‘ইন্ডাস্ট্রি স্কিল এডুকেশন’-এর মতো আধুনিক ও মর্যাদাপূর্ণ নাম বিবেচনা করার পরামর্শ দেন তিনি।
অভিভাবকদের আস্থা অর্জন জরুরি
লেখকের মতে, শুধু নাম পরিবর্তন করলেই হবে না। কারণ, শিক্ষার্থীর শিক্ষাপথ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন অভিভাবকেরা।
তাই তাঁদের সামনে বাস্তব তথ্য তুলে ধরতে হবে—কারিগরি শিক্ষায় পড়ে কত দ্রুত চাকরি পাওয়া যায়, শুরুতেই কত বেতন পাওয়া সম্ভব এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা কতটা উজ্জ্বল।
তিনি বলেন, যদি একজন অভিভাবক জানতে পারেন যে একটি ভালো পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানের ডিপ্লোমাধারী শিক্ষার্থী দুই বছরের মধ্যে একজন সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকের চেয়েও বেশি আয় করতে পারেন, তাহলে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সময় লাগবে না।
আন্তর্জাতিক মানের সনদ গড়ে তোলার আহ্বান
অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক বলেন, বর্তমানে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ দক্ষতা যাচাই বা স্কিল ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করছে। এটিকে বাধা হিসেবে না দেখে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
যদি বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রম আন্তর্জাতিক স্কিল মূল্যায়ন পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়, তাহলে একজন বাংলাদেশি কর্মীকে বিদেশে গিয়ে পুনরায় নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে হবে না।
তিনি উল্লেখ করেন, জাপান, জার্মানি ও অন্যান্য উন্নত দেশে বিপুলসংখ্যক দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। সেখানে সুযোগের অভাব নেই; বরং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষতা অর্জনের সিঁড়িটিই এখনো শক্তভাবে নির্মাণ করা যায়নি।
সংখ্যার চেয়ে মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ার ওপর জোর
প্রবন্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দেশটি অসংখ্য কারিগরি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিবর্তে তুলনামূলক কমসংখ্যক কিন্তু উচ্চমানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে এবং সেগুলোকে সরাসরি শিল্পখাতের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশল গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, কেবল প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ, দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক প্রযুক্তি এবং শিল্পখাতের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
তার মতে, সরকার সমস্যার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে—এটি ইতিবাচক। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ‘বাধ্যতামূলক’ ও ‘দক্ষতাভিত্তিক’ শিক্ষার ধারণাকে বাস্তবে একটি বিশ্বাসযোগ্য সনদব্যবস্থা, সম্মানজনক পরিচয় এবং অভিভাবকদের আস্থায় রূপ দিতে পারার ওপর। তখনই বাংলাদেশের বিপুল জনশক্তিকে প্রকৃত অর্থে দক্ষ সম্পদে পরিণত করে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে।