ঢাকা

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে কলকাতা-শিলিগুড়িতে বিক্ষোভ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
তথ্যসূত্র: বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম

ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision) ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ও শিলিগুড়িতে বিক্ষোভ হয়েছে। বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ, এসআইআরের মাধ্যমে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং এর দায় নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর বর্তায়। তবে নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় এবং ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে নিয়মতান্ত্রিক বলে দাবি করে আসছে।

মঙ্গলবার কলকাতায় ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) উদ্যোগে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে মিছিল ও সমাবেশ হয়। মিছিলে নেতৃত্ব দেন দলটির বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে এসইউসিআইয়ের ডাকে একই দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে।

এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি এখন শুধু পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো দেশজুড়ে এ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ বা অপসারণের দাবি জানাচ্ছে। বুধবার নয়াদিল্লিতে বিরোধীদের ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকেও নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং সিইসির বিরুদ্ধে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

কলকাতায় আইএসএফের মিছিল

মঙ্গলবার বিকেলে কলকাতায় আইএসএফের উদ্যোগে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মিছিল বের হয়। দলটির বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি এতে নেতৃত্ব দেন। সমাবেশ থেকে সিইসির পদত্যাগ ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের দাবি তোলা হয়।

নওশাদ সিদ্দিকি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় আইএসএফের একমাত্র বিধায়ক। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে দলটি গঠিত হয়। ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী দলটি প্রতিষ্ঠা করেন।

কলকাতায় কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস ও বাম দলগুলোর পক্ষ থেকেও এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আপত্তি জানানো হয়েছে। বিরোধীদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে কোনো বৈধ ভোটারের নাম যেন বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

শিলিগুড়িতেও বিক্ষোভ

উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে মঙ্গলবার এসইউসিআইয়ের ডাকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে মিছিল ও সমাবেশ হয়। সেখান থেকে পুরোনো ভোটার তালিকা ব্যবহার করে নির্বাচন পরিচালনার দাবিও তোলা হয়েছে।

বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়লে তাঁদের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এসআইআর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও যাচাইব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক বিরোধীদের বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় নিয়ম মেনেই কাজ করা হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্ঞানেশ কুমার তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং কমিশন অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।

এসআইআর ঘিরে দেশজুড়ে রাজনৈতিক চাপ

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার বিষয়টি বিরোধীদের সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এসব বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভেতরেও মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ্যে এসেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধন ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনার একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছিলেন। বিরোধীরা এসব ঘটনাকে কমিশনের কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণ হিসেবে দেখছে।

অন্যদিকে, কমিশনের বক্তব্য হলো—অভ্যন্তরীণ মতবিনিময় বা মতপার্থক্য প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশ এবং এর মাধ্যমে কমিশনের কাজের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় না।

দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক

এসআইআর নিয়ে বিতর্ক এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিকে সামনে রেখে বুধবার নয়াদিল্লিতে বিরোধীদের ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক বসছে। বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, এসআইআর, ইভিএম-ভিভিপ্যাট এবং সিইসিকে অপসারণের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লি গেছেন। কংগ্রেস, তৃণমূল, বাম দলসহ ইন্ডিয়া জোটের বিভিন্ন শরিকের নেতাদের সেখানে উপস্থিত থাকার কথা।

বৈঠকে জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে পরবর্তী পদক্ষেপ এবং দেশজুড়ে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংসদে সিইসির বিরুদ্ধে অপসারণ প্রস্তাব আনার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।

নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে হাসিরানী রথের মনোনয়ন নিয়ে মামলা খারিজ

এদিকে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচন নিয়েও আইনি লড়াই চলছে। আগামী ৬ অক্টোবর রাজ্যের রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম আসনে উপনির্বাচন হওয়ার কথা।

নন্দীগ্রামে বিজেপির প্রার্থী হাসিরানী রথের মনোনয়নপত্রে বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিল পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস। মঙ্গলবার আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন।

কংগ্রেসের অভিযোগ ছিল, হাসিরানী রথ তাঁর নির্বাচনী হলফনামায় বয়স ৬০ বছরের বেশি উল্লেখ করেছেন। একই নথিতে মাধ্যমিক বা দশম শ্রেণি পাসের সাল হিসেবে ১৯৬৫ উল্লেখ করা হয়েছে। এ দুটি তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করে কংগ্রেস তাঁর প্রার্থিতা বাতিলের আবেদন জানিয়েছিল।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণ রাও মামলাটি খারিজ করে দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের সময় এই বিষয়ে কোনো আপত্তি তোলা হয়নি। এখন এই পর্যায়ে আদালতের হস্তক্ষেপ সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে আদালত কংগ্রেসের জন্য ভবিষ্যতে নির্বাচনী মামলা করার পথ খোলা রেখেছেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। অর্থাৎ, উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার পর আইন অনুযায়ী নির্বাচনী আবেদন করে প্রার্থিতা বা নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয় চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকতে পারে।

হাসিরানী রথের প্রার্থিতা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আলাদা গুরুত্বও পেয়েছে। তিনি চন্দ্রনাথ রথের মা। চন্দ্রনাথ ছিলেন বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারীর সাবেক সহকারী এবং ৬ মে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে নিজ বাড়িতে ফেরার পথে নিহত হন। পরে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে বিজেপি হাসিরানী রথকে প্রার্থী করে।

এসআইআর বিতর্কের রাজনৈতিক প্রভাব

এসআইআরকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা ও ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিরোধী দলগুলো বলছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই, নোটিশ ও আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সম্প্রতি এসআইআর স্থগিত এবং বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনর্বিবেচনার দাবিও তোলা হয়েছে।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও যাচাই একটি নিয়মিত সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং প্রক্রিয়াটি নির্ধারিত নিয়মেই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বর্তমানে যে বিরোধ দেখা দিয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি, বাদ পড়া নামের যাচাই এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা।

কলকাতা ও শিলিগুড়ির বিক্ষোভ থেকে শুরু করে দিল্লিতে বিরোধী জোটের বৈঠক—এসআইআর বিতর্ক এখন পশ্চিমবঙ্গের সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। একই সময়ে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনকে ঘিরে আদালতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তও রাজ্যের নির্বাচনী পরিবেশকে আরও আলোচনার মধ্যে রেখেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স