জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেনা মোতায়েনের আইনি সুযোগ রাখতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নতুন কয়েকটি অযোগ্যতার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাবও তৈরি করেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতায় সীমাবদ্ধতা এবং এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা। তবে সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিষয়ে আপাতত কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না কমিশন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী নিয়ে প্রস্তুত করা সুপারিশ আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় উপস্থাপন করা হবে। কমিশনের অনুমোদন পেলে তা সুপারিশ আকারে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরে সরকার প্রস্তাব গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর জাতীয় সংসদে সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে নতুন বিধান কার্যকর করতে হবে।
চারটি স্থানীয় সরকার আইনে সংশোধনের প্রস্তাব
ইসির আইন ও বিধি সংস্কার কমিটি জেলা পরিষদ বাদে স্থানীয় সরকারের চারটি প্রতিষ্ঠান—ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন—সংক্রান্ত আইনে সংশোধনী আনার প্রস্তাব তৈরি করেছে।
বর্তমানে ২০০৯ সালের ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা আইনে ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’র সংজ্ঞার মধ্যে ‘প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে প্রয়োজন হলে এসব নির্বাচনে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে।
তবে উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন আইনে এমন সংজ্ঞা নেই। নির্বাচন কমিশন এখন এই দুই আইনেও ‘প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ’ বা ‘সশস্ত্র বাহিনী’কে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, যাতে সব স্থানীয় সরকার আইনে একই ধরনের বিধান থাকে।
কেন সেনা মোতায়েনের সুযোগ চায় কমিশন
সাধারণত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমন চর্চা নেই।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আইনে সশস্ত্র বাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে প্রয়োজনে আলাদা নির্বাহী আদেশ ছাড়াই সেনা মোতায়েন করা সহজ হবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনকালে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা পুলিশের মতো ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন এবং প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।
কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন তুলনামূলকভাবে বেশি সংঘাতপূর্ণ হয়ে থাকে। এবারের নির্বাচন দলীয় প্রতীকের বাইরে নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে একই এলাকায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতা স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী হতে পারেন। পাশাপাশি সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো নেতা বা সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেবেন কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
এসব কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন। এ ছাড়া শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও কমিশনের ভেতরে আলোচনা রয়েছে।
‘থাকলেই ব্যবহার করতে হবে, এমন নয়’
ইসির আইন ও বিধি সংস্কার কমিটির প্রধান এবং নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো আইনে সশস্ত্র বাহিনীর বিষয়টি রয়েছে, আবার কোনো কোনো আইনে নেই। কমিশন চায় সব আইনের বিধান অভিন্ন হোক।
তিনি বলেন, আইনে সশস্ত্র বাহিনী সংজ্ঞাভুক্ত না থাকলে তাদের মোতায়েন করা তুলনামূলক কঠিন হয়। তবে আইনে বিধান যুক্ত করা মানেই যে প্রতিটি নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে, এমন নয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজন হলে কমিশন সেই সুযোগ ব্যবহার করতে পারবে।
প্রার্থিতায় নতুন অযোগ্যতার প্রস্তাব
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে দুটি নতুন অযোগ্যতার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাবও দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এর মধ্যে প্রথমটি হলো দ্বৈত নাগরিকত্ব।
বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতা থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তেমন কোনো বিধান নেই। কমিশন চায় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদ ছাড়া স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচিত পদে দ্বৈত নাগরিকরা প্রার্থী হতে না পারেন।
দ্বিতীয় প্রস্তাবটি হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের প্রার্থিতা নিষিদ্ধ করা।
বর্তমান আইনে এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণে কোনো বাধা নেই। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের মতে, তাঁদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ সীমিত করা উচিত। সে কারণে নতুন আইনে তাঁদের অযোগ্যতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, কমিশনের মত হলো, এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক কিংবা সার্বক্ষণিক কর্মচারীরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। একই সঙ্গে দ্বৈত নাগরিকত্বকেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
নিষিদ্ধ দলের নেতাদের অযোগ্য ঘোষণার চিন্তা নেই
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধির খসড়ার ওপর মতামত দিতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামী সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতা-কর্মীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিধান যুক্ত করার দাবি জানায়।
তবে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এ ধরনের বিধান যুক্ত করতে হলে স্থানীয় সরকার আইনের যোগ্যতা ও অযোগ্যতাসংক্রান্ত ধারা সংশোধন করতে হবে। আপাতত কমিশনের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, কোনো নিষিদ্ধ দলের নেতাদের অযোগ্য করার দাবিতে কোনো রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই। তবে যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না, তাই কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে আইনে নির্ধারিত যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়টিই বিবেচনায় আসবে। আইনে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রার্থী হতে পারবেন।
আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবগুলো কমিশন সভায় অনুমোদিত হলে তা সুপারিশ হিসেবে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সরকার প্রস্তাব গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট চারটি স্থানীয় সরকার আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এরপর মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং জাতীয় সংসদে সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে নতুন বিধান কার্যকর হবে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্থানীয় সরকার আইনগুলো অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধন করা হয়েছিল। তখন দলীয় প্রতীকে নির্বাচন আয়োজনের বিধান বাতিল করা হয় এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেই অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে ইতিবাচক উদ্যোগ
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের আগে নানা ধরনের গুজব ও শঙ্কা থাকলেও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ রাখতে ভূমিকা রেখেছিল।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার আইনে সশস্ত্র বাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে ভোটারদের মধ্যে আস্থা বাড়বে এবং নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে ইতিবাচক বার্তা যাবে। তবে তিনি মনে করেন, এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই পরিস্থিতি বিবেচনায় দায়িত্বশীল ও প্রয়োজনভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।