ঢাকা

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে নতুন হুমকি, সৌদির বিরুদ্ধে হুতিদের নৌ অবরোধ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার মধ্যেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকিই বাড়ায়নি, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং তেলের বাজারেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

সোমবার হুতিদের সশস্ত্র বাহিনীর এক বিবৃতিতে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত কার্যত আরও একটি আঞ্চলিক মাত্রা পেল।

‘চোখের বদলে চোখ’ নীতিতে নৌ অবরোধ

বিবৃতিতে হুতিরা অভিযোগ করে, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ‘অন্যায্য ও নিপীড়নমূলক অবরোধ’ বজায় রেখেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতির ভিত্তিতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে সমুদ্রপথে অবরোধ কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

গোষ্ঠীটি দাবি করেছে, এই অবরোধের মাধ্যমে সৌদি আরবের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও নৌ চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

তবে এ ঘোষণার পরপরই সৌদি আরবের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে নতুন মাত্রা

হুতিদের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানা কয়েক দিন ধরে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে।

রোববার দিবাগত রাতে টানা নবম দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায় তেহরান।

ফলে গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

কূটনীতির আভাসের মধ্যেই নতুন উত্তেজনা

উভয় পক্ষের সামরিক অভিযান চললেও একই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান আবারও আলোচনায় ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছে।

কিন্তু সেই সম্ভাবনার মধ্যেই হুতিদের নৌ অবরোধের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনভিত্তিক এই গোষ্ঠীর সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে নতুন ভৌগোলিক পরিসরে ছড়িয়ে দিতে পারে এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেও কঠিন করে তুলতে পারে।

তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব

হুতিদের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয়।

বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করেন, পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগর অঞ্চলে নৌ চলাচল বিঘ্নিত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ আরও সংকুচিত হতে পারে।

তবে পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনার খবর সামনে আসায় তেলের দাম কিছুটা কমে আসে।

বাব-এল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ বাব-এল-মান্দেব প্রণালি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা আরও বাড়ায়, তাহলে আরব সাগর থেকে লোহিত সাগরে প্রবেশের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য হুতিদের ওপর চাপ দিচ্ছিল তেহরান।

এই প্রণালি দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বাব-এল-মান্দেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন ঝুঁকি

ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের মতে, বর্তমান সংকটের ফলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

এর সঙ্গে যদি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ঘোষিত নৌ অবরোধ কার্যকর হয় কিংবা বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে শুধু জ্বালানির দামই নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিপিং খাত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের সর্বশেষ ঘোষণায় স্পষ্ট হয়েছে যে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন আর শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থাকে ঘিরে একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স