জনতার হাতে আটক আসামির জবানবন্দিতে নাম, আত্মগোপনের অভিযোগ; এখনও গঠন হয়নি সাংগঠনিক তদন্ত কমিটি
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম ওরফে জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোকাররম হোসেনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ছাত্রদল বলছে, হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার এক আসামির জবানবন্দিতে তাঁর নাম এসেছে। পাশাপাশি গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন আসামি তাঁর স্বজনদের বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের পর তিনি সংগঠনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করে আত্মগোপনে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাঁর বিরুদ্ধে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রাফিউল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনতার হাতে আটক হওয়া মো. হেলালের দেওয়া জবানবন্দিতে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোকাররম হোসেনের নাম উঠে এসেছে। এছাড়া পুলিশের হাতে আটক তিন আসামি হত্যাকাণ্ডের পর মোকাররমের স্বজনদের বাড়িতে তিন দিন অবস্থান করেছিলেন—এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকেও পাওয়া গেছে।
রাফিউল ইসলাম আরও বলেন, অভিযোগ ওঠার পরও মোকাররম হোসেন সংগঠনের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেননি। বরং তিনি আত্মগোপনে চলে গেছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখনো ছাত্রদলের পক্ষ থেকে পৃথক কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কারের ঘোষণা
এর আগে রোববার কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহাত ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মোকাররম হোসেনকে বহিষ্কারের তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মোকাররম হোসেনকে ছাত্রদলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সংগঠনের সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সংগঠনের শৃঙ্খলা, ভাবমূর্তি এবং নীতিগত অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে ছাত্রদল স্পষ্ট করেছে, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত সাংগঠনিক অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে এবং ফৌজদারি মামলার বিষয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী চলবে।
মোকাররমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে মোকাররম হোসেনের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
যেভাবে হত্যা করা হয় বিএনপি নেতাকে
গত ৫ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে মিঠামইন সদর এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম ওরফে জাহাঙ্গীর (৫২)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুর্বৃত্তরা ধারালো চাপাতি দিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে স্বজনরা তাঁকে উদ্ধার করে কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই হত্যাকাণ্ড এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানে নামে।
ঘটনাস্থল থেকে আটক, পরে আরও দুজন গ্রেপ্তার
হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থল থেকে বরগুনার বামনা উপজেলার চাকাতাসুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. হেলাল (২৪)-কে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
স্থানীয়দের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় হেলাল মোকাররম হোসেনের নাম উল্লেখ করেন। এরপর থেকেই মোকাররম আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
পুলিশ জানায়, ওই রাতেই হেলালকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে অভিযান চালিয়ে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার সুধামপুর গ্রামের মহিন উদ্দিন (৩২) এবং একই উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামের মো. শাহিন আলম (২৭)-কে গ্রেপ্তার করা হয়।
হত্যা মামলা দায়ের
হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পর, গত শনিবার নিহত জাহিদুল আলমের স্ত্রী তসলিমা আক্তার চৌধুরী বাদী হয়ে মিঠামইন থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এদিকে বিএনপি নেতা হত্যার ঘটনায় ছাত্রদলের এক উপজেলা নেতাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে দলীয় শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, মামলার তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।