ঢাকা

বাংলাদেশি দিদারুলকে স্মরণে নিউইয়র্কের বিশেষ উদ্যোগ, তাঁর নামে সড়ক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে দায়িত্ব পালনকালে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন পুলিশ কর্মকর্তা দিদারুল ইসলামের স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে তাঁর নামে একটি সড়কের নামকরণ করেছে নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ। ব্রঙ্কসের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় ‘ডিটেকটিভ ফার্স্ট গ্রেড দিদারুল ইসলাম ওয়ে’ নামের সড়কের নামফলক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে তাঁর অসামান্য সাহসিকতা, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং আত্মত্যাগের প্রতি আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।

শনিবার (স্থানীয় সময়) দুপুরে ব্রঙ্কসে আয়োজিত আবেগঘন এই অনুষ্ঠানে নিউইয়র্ক সিটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, দিদারুল ইসলামের পরিবারের সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৃষ্টিভেজা পরিবেশেও অনুষ্ঠানে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

হামলাকারীকে থামাতে গিয়ে প্রাণ দেন দিদারুল

দিদারুল ইসলাম নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই ম্যানহাটনের পার্ক অ্যাভিনিউয়ের একটি বহুতল ভবনে বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণের ঘটনায় তিনি প্রাণ হারান।

সেদিন এক তরুণ হামলাকারী ভবনে প্রবেশ করে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করলে দিদারুল ইসলাম নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। হামলাকারীকে থামানোর সেই অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৬ বছর।

দায়িত্ব পালনের সময় অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ পরবর্তীতে তাঁকে মরণোত্তর ডিটেকটিভ ফার্স্ট গ্রেড পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর তাঁর আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসন তাঁর নামে একটি সড়কের নামকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

‘তিনি নিউইয়র্ককে নিজের ঘর বানিয়েছিলেন’

সড়কের নামফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের কমিশনার জেসিকা টিস।

তিনি বক্তব্যে বলেন, এই সড়ক এখন থেকে এমন একজন মানুষের নাম বহন করবে, যিনি নিউইয়র্ককে নিজের ঘর হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং সেই শহরকে রক্ষা করতে গিয়েই নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

জেসিকা টিস আরও বলেন, দিদারুল ইসলাম ছিলেন এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যাঁর মতো নিবেদিতপ্রাণ ও দায়িত্বশীল সহকর্মী পাওয়ার প্রত্যাশা প্রত্যেক কমান্ডিং অফিসারই করে থাকেন। তাঁর পেশাদারিত্ব, সাহস এবং কর্তব্যবোধ নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের জন্য গর্বের বিষয় হয়ে থাকবে।

পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা

অনুষ্ঠানে দিদারুল ইসলামের পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন তাঁর ছোট বোনের স্বামী এবং নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের গোয়েন্দা কর্মকর্তা কামরুল হাসান।

তিনি বলেন, নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস বরোর পার্চেস্টারের মতো বাংলাদেশি অধ্যুষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তির নামে সড়কের নামকরণ করা হলো। বিচ অ্যাভিনিউ ও ইস্ট ১৭২ স্ট্রিটের সংযোগস্থলের এই সড়ক এখন থেকে দিদারুল ইসলামের নাম বহন করবে।

কামরুল হাসান বলেন, ব্যক্তিগত জীবনেও দিদারুল সব সময় মানুষের উপকার করার মানসিকতা নিয়ে চলতেন। মানুষের সেবা করাই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। সেই মানবিক গুণ এবং কর্তব্যনিষ্ঠার কারণেই তিনি আজ এমন বিরল সম্মান অর্জন করেছেন। এই সম্মান শুধু তাঁর পরিবারের নয়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও গর্বের।

স্ত্রী-সন্তানদের আবেগঘন উপস্থিতি

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দিদারুল ইসলামের স্ত্রী জামিলা ইসলাম এবং তাঁদের তিন সন্তান—আহিয়ান, আজহান ও আরহাম। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি পুরো অনুষ্ঠানকে আরও আবেগঘন করে তোলে। উপস্থিত বাংলাদেশিরাও তাঁদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং দিদারুল ইসলামের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

মৌলভীবাজার থেকে নিউইয়র্কের বীর পুলিশ কর্মকর্তা

মৌলভীবাজার জেলার সন্তান দিদারুল ইসলাম ২০০৪ সালে অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। নতুন দেশে নিজের জীবন গড়ে তোলার পাশাপাশি তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে যোগ দিয়ে জনসেবার পথ বেছে নেন।

২০১৩ সালে তিনি নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগে যোগ দেন এবং দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনের পুরো সময় তিনি পরিবার নিয়ে ব্রঙ্কসে বসবাস করতেন।

সহকর্মীদের কাছে তিনি একজন সাহসী, মানবিক ও কর্তব্যপরায়ণ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর নামে সড়কের নামকরণ সেই আত্মত্যাগ ও পেশাগত নিষ্ঠারই এক স্থায়ী স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নিউইয়র্ক সিটির বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা মনে করছেন, এই নামকরণ শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তার অবদানকে স্মরণ করার উদ্যোগ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ইতিবাচক অবদান এবং জনসেবায় তাঁদের অংশগ্রহণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। দিদারুল ইসলামের আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দায়িত্ববোধ, সাহস ও জনসেবার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স