ঢাকা

‘পরিবারের সঙ্গে এটাই হয়তো শেষ কথা’—উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে আরাগচির বার্তা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি ও পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনার সময় প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের আশঙ্কার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধান আলোচক আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, আলোচনার টেবিলে বসেও তাঁদের মনে হতো, যেকোনো মুহূর্তে বৈঠকস্থলে বোমা হামলা হতে পারে। এমনকি পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময়ও মনে হয়েছে, সেটিই হয়তো শেষ কথা।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আরাগচি। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত এবং মার্কিন আলোচক দলের প্রধান স্টিভ উইটকফের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি সরাসরি এই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছিলেন।

‘আপনি কি কখনো এমন বৈঠকে ছিলেন?’

স্টিভ উইটকফের সঙ্গে কথোপকথনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হুমকি তেহরানের আলোচকদের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছিল।

তিনি বলেন, ‘আমি উইটকফকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কি কখনো এমন কোনো বৈঠকে অংশ নিয়েছেন, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয়েছে, যেকোনো সময় পুরো বৈঠকটি বোমা হামলার শিকার হতে পারে? ফোনে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় কি কখনো মনে হয়েছে, এটাই হয়তো তাঁদের সঙ্গে শেষ কথা?’

আরাগচির ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার পুরো সময় ইরানি প্রতিনিধিদল এমন মানসিক চাপ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেই দায়িত্ব পালন করেছে।

‘হুমকির মুখেও অবস্থান বদলায়নি তেহরান’

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, অব্যাহত সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও তেহরান নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেনি।

তিনি বলেন, ‘শূন্য মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অবৈধ ও অযৌক্তিক দাবির জবাবে আমরা প্রতিরোধ জানিয়েছি এবং নিজেদের অবস্থানে অটল থেকেছি। তারা যখন বুঝতে পারল, আলোচনার মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়, তখন তারা যুদ্ধের পথ বেছে নেয়।’

আরাগচির দাবি, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গত বছর প্রথমবারের মতো তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। এরপর দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও যোগাযোগ চলতে থাকে। তবে আলোচনার টেবিলে ইরানের দৃঢ় অবস্থানই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আরও কঠোর কৌশল গ্রহণে উৎসাহিত করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনাদের আলোচনা করতে হবে। আমাদের হুমকি দেওয়া যাবে না, ঘুষ বা প্রলোভন দেখিয়েও আমাদের সিদ্ধান্ত বদলানো যাবে না।’

‘১২ দিনের যুদ্ধে তারা ব্যর্থ হয়েছে’

সাক্ষাৎকারে সাম্প্রতিক সংঘাত নিয়েও কথা বলেন আরাগচি। তাঁর দাবি, ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানকে পরাজিত করার লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

তিনি বলেন, ‘তারা ওই যুদ্ধে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে ইরান ভয় পায় না।’

‘ইরান ভেনেজুয়েলা নয়’

সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে ফেলা সম্ভব—ওয়াশিংটনের এমন ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আরাগচি বলেন, ‘এটি ভেনেজুয়েলা নয় যে একজনকে ধরে নিয়ে গেলে বাকিরা ভয়ে পিছু হটে যাবে।’

তাঁর ভাষ্য, ইরানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কোনো একক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত নয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত এবং সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়। ফলে একজন নেতাকে সরিয়ে দিলেই পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।

নতুন করে উত্তেজনা

আরাগচির এই মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে।

নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতে সোমবার টানা নবম দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন হামলার খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এদিকে সংঘাতের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স