ঢাকা

সংঘাতের পাশাপাশি কূটনীতি, আলোচনার কথা জানাল যুক্তরাষ্ট্র–ইরান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
টানা সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলা, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন সংকটের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। উভয় দেশই ইঙ্গিত দিয়েছে, সংঘাত চললেও আলোচনার পথ এখনো খোলা রয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেও রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

রয়টার্স ও আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেই রয়েছে। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিশ্চিত করেছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান–প্রদান অব্যাহত আছে এবং বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে যোগাযোগ চলছে।

কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র

গত রোববার রাতে দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সব সময় এমন একটি কূটনৈতিক সমাধান চায়, যা বাস্তবসম্মত হবে এবং যার শর্ত ইরান কার্যকরভাবে মেনে চলতে প্রস্তুত থাকবে।

তাঁর ভাষায়, সামরিক উত্তেজনা সত্ত্বেও আলোচনা বন্ধ হয়নি। তবে ভবিষ্যতের যেকোনো সমঝোতা হতে হবে কার্যকর, টেকসই এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষাকারী।

রুবিও আরও সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক জলপথে হামলা কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, যুদ্ধের পাশাপাশি আলোচনার পথও খোলা রাখা হয়েছে।

মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ চলছে: ইরান

সোমবার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার পরও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

তিনি জানান, বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে তেহরানের কাছে একাধিক বার্তা ও প্রস্তাব এসেছে। যদিও এসব বার্তার বিস্তারিত প্রকাশ করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।

বাঘাই বলেন, "মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আমরা বার্তা পেয়েছি। এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাই না। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে এবং বিভিন্ন পক্ষ আমাদের কাছে নানা প্রস্তাব ও ধারণা পৌঁছে দিয়েছে।"

তাঁর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়, যুদ্ধক্ষেত্রে সংঘাত চললেও রাজনৈতিক যোগাযোগের চ্যানেল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

নবম দিনের মতো হামলা, পাল্টা জবাব ইরানের

সংঘাতের ধারাবাহিকতায় টানা নবম দিনের মতো রোববার দিবাগত রাতেও ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালায়।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা জর্ডানের আকাবায় অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটি, কুয়েতের আল-আদিরি ক্যাম্প, আলী আল–সালেম বিমানঘাঁটি এবং সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

অন্যদিকে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় দেশজুড়ে সতর্কসংকেত বাজানো হয়েছে। কুয়েতের সেনাবাহিনীও দাবি করেছে, তারা ইরান থেকে পাঠানো একাধিক ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত করেছে।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা

নতুন করে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি।

ইরানের দাবি, প্রণালিতে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে এবং জাহাজ দুটি অচল হয়ে পড়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে এবং হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় সামরিক অভিযান শুরু করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় সেখানে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, নৌবাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানের বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণের খবর

ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, সোমবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাবরিজ, চাবাহার, কোনারাক, বন্দর মাহশাহর এবং বন্দর ইমাম খোমেনি এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

এসব হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

যুদ্ধবিরতির সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়েছে

গত ১৭ জুন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া ওই সমঝোতাকে তখন সংঘাত নিরসনের সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার পর সেই সমঝোতা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অবস্থানের পর ইরানও আনুষ্ঠানিকভাবে ওই সমঝোতা স্থগিতের ঘোষণা দেয়।

সংঘাত ও আলোচনার দ্বৈত বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে একদিকে যেমন সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি কূটনৈতিক যোগাযোগও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তেজনা বাড়লেও ভবিষ্যতে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তবে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভর করবে সংকট কোন দিকে মোড় নেয়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স