মিসরের একটি বন্দরে ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন দুটি গ্যাসবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হামলার ঘটনাটি সুয়েজ খাল ও এর সঙ্গে সংযুক্ত কৌশলগত সুমেদ (SUMED) পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি সুয়েজ খালের কার্যক্রম কোনোভাবে ব্যাহত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে আরও দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করতে হবে। এর প্রভাব পড়তে পারে এশিয়াসহ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, পরিবহন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতিতে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই সুমেদ পাইপলাইন সৌদি আরবের তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। লোহিত সাগর থেকে শুরু হয়ে পাইপলাইনটি মিসরের ভেতর দিয়ে ভূমধ্যসাগরের সিদি কেরির বন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে নিরাপত্তা সংকট বাড়ায় এই রুটের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
ড্রোন হামলার পর বাড়ছে উদ্বেগ
গত বুধবার মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর দামিয়েত্তায় দুটি গ্যাস ট্যাংকারে ড্রোন হামলা হয়। হামলার দায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ স্বীকার করেনি। সুয়েজ খালকে লক্ষ্য করে সরাসরি কোনো হুমকিও দেওয়া হয়নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এমএসটি মারকুই–এর জ্বালানি গবেষণা বিভাগের প্রধান সল কাভোনিক বলেন, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ ও ভূমধ্যসাগরের বিকল্প পথও যদি ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হুমকির মুখে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রায় অচল, লোহিত সাগরেও বাড়ছে ঝুঁকি
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ একসময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। কিন্তু চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে এখন ওই রুট দিয়ে প্রায় কোনো ট্যাংকারই চলাচল করছে না।
এ অবস্থায় সৌদি আরব তাদের তেলের বড় অংশ ইয়ানবু বন্দর হয়ে লোহিত সাগরের পথে পাঠানো শুরু করে। তবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা ও নতুন হুমকির কারণে সেই পথও এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে সুয়েজ খাল ও সুমেদ পাইপলাইন কার্যত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুটে পরিণত হয়েছে।
এশিয়ার বাজারে বাড়তে পারে চাপ
বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলার–এর তথ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খাল ও সুমেদ পাইপলাইনের দিকে উত্তরমুখী সৌদি তেলবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে। তবে এশিয়ার জন্য এর অর্থ হলো, আগের তুলনায় অনেক দীর্ঘ সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
বাব আল-মানদেব প্রণালি এড়িয়ে আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে জাহাজ চলাচল করায় পরিবহন সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এতে বিশেষ করে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো বেশি প্রভাবিত হতে পারে।
হুতিদের হুমকির পর রুট পরিবর্তন
গত ২০ জুলাই বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় হুতি বিদ্রোহীরা। এরপর সৌদি আরব সুমেদ পাইপলাইনের ব্যবহার আরও বাড়িয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়েছিল। জুলাই মাসে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি ৮৮ লাখ ব্যারেলে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিক–এর তথ্যে দেখা গেছে, সুয়েজ খালের ভূমধ্যসাগরীয় প্রবেশমুখ পোর্ট সাইডে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে।
দক্ষিণমুখী রুটে কমেছে তেল পরিবহন
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাব আল-মানদেব দিয়ে এশিয়ার দিকে দক্ষিণমুখী তেল পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে ইয়ানবু বন্দর থেকে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮১ শতাংশ দক্ষিণমুখী ছিল। জুলাইয়ে তা কমে মাত্র ৪৩ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও চীনের মালিকানাধীন কিছু ট্যাংকার বিশেষ অনুমতি নিয়ে এখনো ওই পথ ব্যবহার করছে।
এদিকে হুতিদের হামলার আশঙ্কায় অনেক জাহাজ নিজেদের অবস্থান শনাক্তকারী ট্র্যাকিং ব্যবস্থা (AIS) বন্ধ রেখেই চলাচল করছে বলে জানিয়েছেন ভোর্টেক্সার বিশ্লেষক জর্জ মরিস।
সুয়েজ কি এখনই ঝুঁকিতে?
জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সুয়েজ খালের কার্যক্রমে তাৎক্ষণিক কোনো বিঘ্নের আশঙ্কা নেই।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি–এর আটলান্টিক এলএনজি বিভাগের প্রধান অ্যালি ব্লেকওয়ে বলেন, বর্তমান বাজার এখনো সুয়েজ খালের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার মতো ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে না।
এ কারণেই ড্রোন হামলার পরও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। কারণ ব্যবসায়ীদের নজর ছিল ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান কূটনৈতিক আলোচনার দিকে।
বিমা ব্যয় বাড়তে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, সুয়েজ খালে সরাসরি হামলা না হলেও এ অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার কারণে জাহাজের যুদ্ধঝুঁকি বিমার (War Risk Premium) খরচ বাড়তে পারে।
আর্গাসের এলএনজি মূল্য বিশ্লেষক মার্টিন সিনিয়র বলেন, মিসরের সাম্প্রতিক হামলার পর বিমা কোম্পানিগুলো সুয়েজ রুট ব্যবহারকারী জাহাজের জন্য অতিরিক্ত যুদ্ধঝুঁকি প্রিমিয়াম আরোপ করতে পারে।
ইতোমধ্যে একাধিক শিপিং কোম্পানি সুয়েজ খালের আশপাশের বন্দরগুলোয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করেছে।
সুয়েজ খাল বন্ধ হলে কী হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো কারণে সুয়েজ খালের কার্যক্রম ব্যাহত হয়, তাহলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলবাহী সুপার ট্যাংকারগুলো এমনিতেই পুরো বোঝাই অবস্থায় সুয়েজ খাল পার হতে পারে না। সেগুলোকে আগে সুমেদ পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু তেল নামিয়ে পরে আবার ভূমধ্যসাগরে তুলে নিতে হয়। ফলে সুয়েজ ও সুমেদ—দুই অবকাঠামোই একে অপরের পরিপূরক।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ড্রায়াড গ্লোবাল–এর প্রধান নির্বাহী কোরি র্যান্সলেম বলেন, সুয়েজ খাল অঞ্চলে যেকোনো হামলার ফলে যুদ্ধঝুঁকির বিমা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা মূল্যায়ন বদলে যাবে।
অন্যদিকে কেপলারের প্রধান ফ্রেইট বিশ্লেষক ম্যাথিউ রাইটের মতে, সুয়েজ খালের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়বে। দীর্ঘ সমুদ্রপথ, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ বিলম্বের কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে।