ঢাকা

বিদ্যুৎ বিল নিয়ে প্রশ্ন তুললেন গোলাম পরওয়ার, সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রাজধানী ঢাকায় বিদ্যুৎ–গ্যাস সংকট, লোডশেডিং, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বিদ্যুতের ‘ভুতুড়ে বিল’ ইস্যুতে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন, বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও অনেক গ্রাহকের কাছে অস্বাভাবিক বা ‘ভুতুড়ে’ বিল পৌঁছাচ্ছে। সরকারের নজরদারির অভাব এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণেই সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে তিনি দাবি করেন।

সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।

‘তদন্তের কথা বলা হলেও বাস্তবে ব্যবস্থা নেই’

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বিল নিয়ে তদন্ত ও পুনর্যাচাইয়ের কথা বললেও বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

তাঁর ভাষায়, তদারকির ঘাটতির কারণে সাধারণ গ্রাহকেরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব পালন না করায় সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

‘সরকার সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত, জনদুর্ভোগে নজর নেই’

সরকারের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, সরকার বর্তমানে সংবিধান, জুলাই সনদ এবং রাজনৈতিক নানা ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও মানুষের নিত্যদিনের দুর্ভোগ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস–সংকট ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলায় নতুন নতুন বয়ান তৈরিতে সরকার মনোযোগী হলেও জনগণের জীবনযাত্রার সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

গ্যাসের চাহিদা–সরবরাহের বড় ঘাটতির দাবি

সংবাদ সম্মেলনে দেশের গ্যাস পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে ২১৫ কোটি ঘনফুটেরও কম। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতার কারণে ব্যয়ও বাড়ছে।

এ ছাড়া দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, নতুন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি। আগের সরকারের মতো বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না।

রান্না থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন—সবখানেই সংকট

গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় রান্নার কাজে পড়ছে বলে উল্লেখ করেন গোলাম পরওয়ার। পাশাপাশি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ব্যয়ও বেড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, গ্যাসের ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর ফলে দেশজুড়ে লোডশেডিং বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটছে।

‘গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে’

পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বাড়াতে জরুরি বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং জ্বালানি খাতে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।

‘পাঁচ মাসে মানুষের ক্ষোভ বেড়েছে’

বর্তমান সরকারের পাঁচ মাসের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে গোলাম পরওয়ার বলেন, এই সময়ে মানুষের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

তিনি দাবি করেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান–সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের জনগণের নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

‘শত শত ভুতুড়ে বিলের কপি আছে’

সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের ‘ভুতুড়ে বিল’ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, তাঁদের কাছে শত শত অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের কপি রয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, সংসদে প্রধানমন্ত্রী এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী সার্ভিস চার্জ না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনো সেই চার্জ আদায় করা হচ্ছে।

এ ছাড়া প্রিপেইড মিটারে ‘ডিমান্ড চার্জ’ কাটা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি কার্যত ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’।

‘জুনে কম, জুলাইয়ে বেশি বিল’

নাজিবুর রহমান মোমেন আরও দাবি করেন, অর্থবছরের শেষ মাস জুনে সিস্টেম লস কম দেখানোর জন্য অনেক ক্ষেত্রে অনুমানের ভিত্তিতে কম বিল করা হয়। পরে জুলাই মাসে প্রকৃত মিটার রিডিং অনুযায়ী বিল করলে গ্রাহকদের অনেক বেশি টাকা পরিশোধ করতে হয়।

তিনি বলেন, প্রতিবছর বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে কেন প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, সেটি জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটির প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্তেরও দাবি জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিতি

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকারসহ দলের অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স