ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ ছয় মাসে গড়িয়েছে। দীর্ঘায়িত এই সংঘাতের ফলে মার্কিন সামরিক অস্ত্রভান্ডারের সক্ষমতা, যুদ্ধ ব্যয়, সেনা হতাহত এবং অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে একাধিক বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের কোনো ঘাটতি নেই, বর্তমান সংকটের জন্য দায়ী সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ইউক্রেনকে বিপুল অস্ত্র সহায়তা দেওয়া, তেলের দাম দ্রুত কমছে এবং ইরান যুদ্ধে মার্কিন ক্ষয়ক্ষতি অতীতের বড় যুদ্ধগুলোর তুলনায় খুবই সীমিত।
তবে মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস এসব বক্তব্য বিশ্লেষণ করে বলেছে, ট্রাম্পের কয়েকটি দাবিতে আংশিক সত্যতা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট বাদ দেওয়া হয়েছে অথবা তথ্যকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অস্ত্রের সংকটের জন্য কি শুধু ইউক্রেন দায়ী?
সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখনও প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে বিপুল অস্ত্র পাঠিয়ে মার্কিন অস্ত্রভান্ডার দুর্বল করে দিয়েছে।
ফ্যাক্ট চেকে বলা হয়েছে, বাইডেন প্রশাসন সত্যিই ইউক্রেনকে শতাধিক ধরনের সামরিক সরঞ্জাম, গোলাবারুদ ও যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করেছিল। এতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অস্ত্রের মজুত কমেছিল। তবে বর্তমানে যে অস্ত্রসংকট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার মূল কারণ ইউক্রেন নয়; বরং ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র।
নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, ইউক্রেনে পাঠানো অধিকাংশ অস্ত্র ছিল স্থলযুদ্ধের জন্য ব্যবহৃত ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, ট্রাক, কামান, মর্টার, জ্যাভলিন, টো অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান মূলত আকাশভিত্তিক হামলা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রনির্ভর।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)–এর যুদ্ধ অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মেরিন কোর কর্নেল মার্ক এফ কানসিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনে পাঠানো অধিকাংশ অস্ত্রের সঙ্গে ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রের মিল খুবই কম।
কোন অস্ত্রের মজুত কমছে
নিউইয়র্ক টাইমস ও অন্যান্য সামরিক বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক হারে ব্যবহার করেছে দূরপাল্লার আক্রমণ ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র।
প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী—
প্রায় ২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রায় ৩ হাজার টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে এক হাজারের বেশি ব্যবহার হয়েছে।
৪ হাজার ৪০০টি জেএএসএসএম ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে এক হাজারের বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।
৯০টি প্রিসিশন স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ৪০ থেকে ৭০টি ব্যবহার করা হয়েছে।
৪১০টি এসএম–৩ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৩০ থেকে ২৫০টি ব্যবহৃত হয়েছে।
১ হাজার ১৬০টি এসএম–৬ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ৯০ থেকে ৩৭০টি ব্যবহার হয়েছে।
৩৬০টি থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৯০ থেকে ২৯০টি ব্যবহৃত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্ত্রগুলোর বেশির ভাগই ইউক্রেনে পাঠানো হয়নি। ফলে বর্তমান সংকটের জন্য কেবল ইউক্রেনকে দায়ী করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
অন্যদিকে, ইউক্রেনে পাঠানো হয়েছিল মাত্র প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিপুলসংখ্যক স্টিংগার ক্ষেপণাস্ত্র, কামানের গোলা ও অ্যান্টি-ট্যাংক অস্ত্র।
পেন্টাগন কী বলছে
পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কংগ্রেসের বরাদ্দ অর্থ দিয়ে ইউক্রেনে পাঠানো জ্যাভলিন, স্টিংগার, ১৫৫ মিলিমিটার কামানের গোলা এবং বিভিন্ন সাঁজোয়া যান পুনরায় সংগ্রহ করা হয়েছে।
অর্থাৎ ইউক্রেনে পাঠানো সরঞ্জামের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তবে ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত উন্নত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন তুলনামূলক ধীরগতির হওয়ায় সেগুলোর মজুত নিয়েই উদ্বেগ বেশি।
তেলের দাম নিয়ে ট্রাম্পের দাবি
ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির কারণে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, বক্তব্যটি আংশিক সত্য।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে লড়াই সাময়িকভাবে কমে আসার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৮ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) অপরিশোধিত তেলের দামও ৭ শতাংশের বেশি কমে প্রায় ৮৩ ডলারে দাঁড়ায়।
তবে পুরো চিত্রটি ভিন্ন।
যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার। অর্থাৎ সাম্প্রতিক পতনের পরও দাম যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি রয়েছে।
এর মধ্যেই কয়েক দফা তেলের দাম ৯০ থেকে ১০০ ডলার পর্যন্ত ওঠানামা করেছে।
হোয়াইট হাউস অবশ্য বলছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে তেলের দাম আরও কমতে পারে।
হতাহতের তুলনা নিয়েও প্রশ্ন
ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে দাবি করেন, বর্তমান সংঘাতে ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক খুবই কম।
নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, তিনি যে সংখ্যাগুলো উল্লেখ করেছেন, তার বেশির ভাগই মোটামুটি সঠিক হলেও তুলনাটি বিভ্রান্তিকর।
কারণ, তিনি নিজের প্রশাসনের কয়েক মাসের সীমিত সামরিক অভিযানের সঙ্গে আগের প্রশাসনগুলোর বহু বছরের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের তুলনা করেছেন।
পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী—
আফগানিস্তান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনা ছিলেন প্রায় ২ হাজার ৩৫০ জন।
ইরাক যুদ্ধে নিহত হন প্রায় ৪ হাজার ৪১৮ জন।
অন্যদিকে ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন, যা পেন্টাগনের তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে তিনি আহত সেনাদের সংখ্যা উল্লেখ করেননি। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে ইতোমধ্যে ৬০০ জনের বেশি মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে দুই মার্কিন সেনা নিহত হন। আবার ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আফগানিস্তান ও অন্যান্য সামরিক অভিযানে ৬০ জনের বেশি মার্কিন সেনা প্রাণ হারান। এসব তথ্য তাঁর প্রকাশিত তুলনামূলক চার্টে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
নিউইয়র্ক টাইমসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ট্রাম্পের বক্তব্যে কিছু বাস্তব তথ্য থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অস্ত্রসংকটের জন্য শুধু ইউক্রেনকে দায়ী করা, তেলের দামের সাময়িক পতনকে স্থায়ী প্রবণতা হিসেবে উপস্থাপন করা এবং বিভিন্ন সময়ের ভিন্ন ধরনের যুদ্ধের হতাহতের সংখ্যা সরাসরি তুলনা করা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবচিত্র তুলে ধরে না।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ ব্যয়, অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতি এখন ওয়াশিংটনের জন্য অন্যতম বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।