আল–জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে আরব-আমেরিকান ও মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান দ্রুত বদলে যাচ্ছে। গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থায় ফাটল ধরেছে এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের মধ্যে। ফলে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর আবারও আসন্ন নির্বাচনী লড়াইয়ে গাজা ইস্যুই ডেমোক্র্যাটদের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একসময় ডেমোক্র্যাটদের নির্ভরযোগ্য ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত আরব-আমেরিকান ভোটারদের বড় একটি অংশ এখন প্রার্থী বাছাইয়ে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করছে। দলীয় পরিচয়ের চেয়ে গাজা যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি এখন তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে প্রধান প্রভাব ফেলছে।
‘ডেমোক্র্যাটদের জবাবদিহির মুখে ফেলতেই সেই সিদ্ধান্ত’
ইয়েমেনি-আমেরিকান অধিকারকর্মী সামরা লোকমান ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সেটি ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন নয়; বরং গাজা যুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল।
আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, গাজায় চলমান হত্যাযজ্ঞের সময় ডেমোক্র্যাটদের আবারও ভোট দেওয়া তাঁদের কাছে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
লোকমানের ভাষায়,
“গণহত্যার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই হতো। আমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তা নিয়ে আমাদের কোনো অনুশোচনা নেই।”
তিনি বলেন, শুরু থেকেই তিনি জানতেন ট্রাম্পের অনেক নীতির সঙ্গে তাঁর মতের মিল নেই। তবু ডেমোক্রেটিক পার্টিকে রাজনৈতিকভাবে জবাবদিহির মুখে ফেলতে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
‘দুই খারাপ বিকল্পের মধ্যে কম খারাপকে বেছে নেওয়ার রাজনীতি আর কাজ করছে না’
মিশিগানের ডেট্রয়েট অঞ্চলের রাজনৈতিক কৌশলবিদ হুসেইন দাবাজেহ বলেন, আরব-আমেরিকান ভোটারদের কাছে এখন আর ‘দুই খারাপ বিকল্পের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম খারাপকে বেছে নেওয়ার’ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
তাঁর মতে, গাজা যুদ্ধের সময় ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের ভূমিকা বহু ভোটারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে।
দাবাজেহ বলেন,
“নিজের বিবেকের কাছে সৎ থেকে আমি কাউকেই কমলা হ্যারিস বা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিতে বলতে পারতাম না।”
ডেমোক্র্যাটদের প্রতি ক্ষোভের মূল কারণ
আরব-আমেরিকান ভোটারদের অভিযোগ, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য কার্যকর চাপ সৃষ্টি করেনি।
তাঁদের মতে, ফিলিস্তিন ও লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান চলার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।
এছাড়া তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
এসব কারণে বহু আরব-আমেরিকান ভোটার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং ডেমোক্র্যাটদের প্রতি আস্থা হারান।
ট্রাম্পের প্রচারণা ও পরবর্তী বাস্তবতা
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ‘শান্তির প্রার্থী’ হিসেবে তুলে ধরেন এবং মিশিগানের আরব ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
তিনি ডেট্রয়েটের উপকণ্ঠের ডিয়ারবর্ন এলাকায় সফর করেন এবং নির্বাচনী সমাবেশে স্থানীয় কয়েকজন মুসলিম ইমামকে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর নীতিতে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করছেন আরব-আমেরিকানদের অনেকেই।
সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প ইসরায়েলের গাজা ও লেবানন অভিযান অব্যাহত রাখার সুযোগ দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
এছাড়া ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বহিষ্কার কার্যক্রম এবং ইয়েমেনিদের জন্য বিদ্যমান অস্থায়ী অভিবাসন সুরক্ষা কর্মসূচি বাতিলের সিদ্ধান্তও আরব ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
‘আজ আর কেউ ট্রাম্পকে নিয়ে সন্তুষ্ট নন’
বর্তমানে আরব-আমেরিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কেমন—এমন প্রশ্নের জবাবে রাজনৈতিক কৌশলবিদ হুসেইন দাবাজেহ বলেন,
“তাঁরা তাঁকে ঘৃণা করেন। আমি এমন কাউকে চিনি না, যিনি ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন এবং এখন তাঁর কর্মকাণ্ড দেখে সন্তুষ্ট আছেন।”
তাঁর মতে, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়ার অর্থ ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন ছিল না; বরং সেটি ছিল ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক বার্তা।
‘গাজা আমাদের রাজনীতিকে বদলে দিয়েছে’
ডিয়ারবর্ন শিক্ষা বোর্ডের ট্রাস্টি ও কৌতুকশিল্পী আমের জাহর বলেন, ট্রাম্পের মুসলিমবিরোধী নীতির অভিজ্ঞতা তাঁদের নতুন নয়।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৭ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন।
তবুও গাজার পরিস্থিতি তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাহর বলেন,
“ট্রাম্প কতটা ক্ষতি করতে পারেন, সেটা আমরা খুব ভালো করেই জানি। কিন্তু গাজায় যা ঘটেছে, তা আমাদের এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে আমরা রাজনীতিকদের ‘না’ বলতে শিখেছি।”
মিশিগানে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
মিশিগানে আবার নির্বাচনী মৌসুম শুরু হওয়ায় আরব-আমেরিকান ভোটাররা নতুন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছেন।
এই মুহূর্তে তাঁদের একটি বড় অংশ ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদকে সমর্থন দিচ্ছেন।
যদিও অতীতে তিনি কমলা হ্যারিসকে সমর্থন করেছিলেন, তবু বর্তমানে গাজা যুদ্ধ নিয়ে তাঁর সমালোচনামূলক অবস্থান আরব-আমেরিকান ভোটারদের আকৃষ্ট করছে।
সামরা লোকমান জানান, তিনি ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক বাছাইপর্বে এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে আবদুল আল-সাইয়েদ ও কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিবকে ভোট দেবেন।
তাঁর মতে, যদি ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রগতিশীল ও ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থীদের এগিয়ে আনে, তাহলে দলটি আরব-আমেরিকানদের আস্থা আবারও ফিরে পেতে পারে।
‘এখন গাজাই সবচেয়ে বড় ইস্যু’
সামরা লোকমান বলেন, তাঁদের কমিউনিটির কাছে এখন গাজা, ফিলিস্তিন এবং মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু।
তিনি বলেন,
“আপনি রিপাবলিকান হোন কিংবা ডেমোক্র্যাট—যদি আপনি আইপ্যাকের বিরোধিতা করেন এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সমর্থন করেন, তাহলে আমাদের ভোট পাবেন।”
এখানে তিনি আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (AIPAC)–এর কথা উল্লেখ করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবি সংগঠন।
‘গাজার শিশুদের রক্তের মূল্য আছে’
আমের জাহর বলেন, অনেকেই চান আরব-আমেরিকানরা যেন শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি বা অন্যান্য ইস্যুর ভিত্তিতে ভোট দেন।
কিন্তু তাঁর মতে, যখন তাঁদের স্বজনেরা নিহত হচ্ছেন এবং তাঁদের জন্মভূমি ধ্বংস হচ্ছে, তখন ফিলিস্তিন প্রশ্নকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন,
“আমরা বলেছি, ‘না’। গাজার শিশুদের রক্তের মূল্য আছে।”
জাহরের দাবি, শুধু আরব-আমেরিকানরাই নন; যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সাম্প্রতিক প্রাথমিক নির্বাচনে ইসরায়েলপন্থী একাধিক প্রার্থীও ভোটারদের প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়েছেন।
ইসলামবিদ্বেষ ও নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা গাজা ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে আরব ও মুসলিম ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল।
তবে নির্বাচনের পর রিপাবলিকান শিবিরের কিছু নেতার মুসলিমবিরোধী বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাম্প কংগ্রেস নির্বাচনে ফ্লোরিডার রিপাবলিকান রাজনীতিক র্যান্ডি ফাইনকে সমর্থন দেন। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক মুসলিমবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ফ্লোরিডা ও টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নররা কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (CAIR)–কে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মিশিগানের গভর্নর পদপ্রার্থী রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য জন জেমসও সিএআইআরকে কালো তালিকাভুক্ত করার অঙ্গীকার করেছেন।
সামরা লোকমানের মতে, রিপাবলিকান পার্টির সামনে আরব-আমেরিকানদের দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের দিকে টানার একটি বড় সুযোগ ছিল। কিন্তু মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও নীতির কারণে তারা সেই সম্ভাবনা নষ্ট করেছে।
তিনি বলেন,
“তারা সত্যিই একটি বড় রাজনৈতিক সুযোগ হারিয়েছে।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মিশিগানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে গাজা যুদ্ধ এখন শুধু একটি পররাষ্ট্রনীতি ইস্যু নয়; বরং এটি আরব-আমেরিকান ও মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে অন্যতম প্রধান নিয়ামকে পরিণত হয়েছে। আগামী নির্বাচনে এই ভোটব্যাংকের অবস্থান ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।