ঢাকা

আল–জাজিরা: চতুর্থ মেয়াদের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়বেন লুলা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা আনুষ্ঠানিকভাবে চতুর্থ মেয়াদের জন্য নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে সেটিই হবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ মেয়াদ বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তবে এবারের নির্বাচনী প্রচারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচির পাশাপাশি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিরোধকে প্রধান রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে সামনে আনছেন লুলা।

রোববার সাও পাওলোতে ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির (পিটি) সমর্থকদের এক সমাবেশে ৮০ বছর বয়সী লুলা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি সপ্তমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছেন। এর আগে তিনি ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদ এবং ২০২৩ সাল থেকে বর্তমান মেয়াদে দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সার্বভৌমত্বকে নির্বাচনী ইস্যু করছেন লুলা

সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে লুলা বলেন, ব্রাজিলকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে কোনো বিদেশি শক্তি দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সাহস না পায়। একই সঙ্গে তিনি বিরল খনিজ সম্পদসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিহত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, ব্রাজিলের সম্পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ব্রাজিলই। চীন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ফ্রান্স—কোনো দেশই ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বকে উপেক্ষা করে দেশটির খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার পাবে না।

লুলার এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক আবারও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা

গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের বিভিন্ন পণ্যের ওপর দুই দফা শুল্ক আরোপ করে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ব্রাজিল অন্যায্য বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করছে। যদিও এ অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ব্রাজিল সরকার।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর পরিবারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছেন। ২০২২ সালের নির্বাচনের ফল উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় জইর বলসোনারো এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। তাঁর পরিবর্তে ডানপন্থী শিবিরের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছেন তাঁর ছেলে ও সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো।

সমাবেশে লুলা ফ্লাভিও বলসোনারোকে ‘জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা ব্যক্তি’ বলে মন্তব্য করেন। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফ্লাভিও।

রাজনৈতিক কৌশলে ‘জাতীয়তাবাদ’

গেতুলিও ভার্গাস ফাউন্ডেশনের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক লিওনার্দো পাজের মতে, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি লুলার জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশল।

তাঁর ভাষ্য, দেশের নানা সমস্যার জন্য বাইরের শক্তিকে দায়ী করার রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে লুলা জাতীয়তাবাদী অবস্থানকে সামনে এনে ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখতে চাইছেন।

হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

সাম্প্রতিক ডেটাফোলহা জরিপে দেখা গেছে, সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে লুলা ৪৮ শতাংশ এবং ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৩ শতাংশ সমর্থন পেতে পারেন। যদিও এই ব্যবধান এখনো খুব বেশি নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশটি এখনো বামপন্থী ও বলসোনারো–সমর্থিত ডানপন্থী ভোটারদের মধ্যে স্পষ্টভাবে বিভক্ত। ফলে এবারের নির্বাচনও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অর্থনীতি তুলে ধরছেন লুলা

নির্বাচনী প্রচারে লুলা তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যও সামনে আনছেন। তিনি দাবি করছেন, তাঁর সরকারের সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেছে।

সমাবেশে অংশ নেওয়া সমাজকর্মী ক্রিস্তিয়ানে রোসা হুলিও বলেন, লুলার সামাজিক কর্মসূচির কারণেই তাঁদের পরিবার প্রথমবারের মতো নিজস্ব বাড়ির মালিক হতে পেরেছে।

সরকারের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ

তবে সরকারের সামনে একাধিক বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বাজেট ঘাটতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের প্রভাব রয়েছে এমন এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগও দুই রাজনৈতিক শিবিরের জন্য বিব্রতকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যাংকারের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করার অভিযোগ তদন্তাধীন। অন্যদিকে লুলার এক ছেলের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে।

বয়স নিয়ে সমালোচনার জবাব

নিজের বয়স নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনারও জবাব দিয়েছেন লুলা। তিনি বলেন, নিয়মিত শরীরচর্চা ও হাঁটার কারণে তিনি এখনো সুস্থ ও কর্মক্ষম আছেন। এমনকি ২০০২ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সময়ের তুলনায় নিজেকে আরও বেশি ফিট বলে দাবি করেন তিনি।

সামনে কী ইস্যু

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে লুলা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সামাজিক কর্মসূচি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকারকে প্রচারের মূল ভিত্তি করবেন। অন্যদিকে বিরোধীরা মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, জননিরাপত্তা, বাজেট সংকট এবং সরকারের বিভিন্ন বিতর্ককে নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হিসেবে সামনে আনবে।

ফলে আগামী অক্টোবরের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং ব্রাজিলের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা, জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স