রাজধানীর বকশীবাজারে সরকারি মাদ্রাসা–ই–আলিয়া (ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা) এলাকায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, সংঘর্ষ এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা এলাকা ছেড়ে গেলে ছাত্রদল ও যুবদলের শতাধিক নেতা-কর্মী মাদ্রাসার একমাত্র আবাসিক হল আল্লামা কাশগরী (রহ.) হলে প্রবেশ করেন।
এরপর হলের ভেতরে ভাঙচুর, কয়েকটি কক্ষে হামলা, শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দেওয়া এবং হলের ফটকে তালা লাগানোর ঘটনা ঘটে। একই সঙ্গে মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে মারধরের অভিযোগও উঠেছে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করেছে এবং আহতের সংখ্যাও ভিন্নভাবে দাবি করেছে।
সন্ধ্যায় ছাত্রশিবির সরে গেলে হলে প্রবেশ ছাত্রদল–যুবদলের
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা মাদ্রাসা এলাকা ত্যাগ করলে যুবদলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকশ নেতা-কর্মী আল্লামা কাশগরী (রহ.) হলে প্রবেশ করেন।
সে সময় পুলিশ সদস্যরা মাদ্রাসার বাইরে অবস্থান করলেও হলে প্রবেশ ঠেকাতে তাদের কোনো দৃশ্যমান হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি।
ভাঙচুর ও কক্ষে হামলার অভিযোগ
হলে প্রবেশের পর ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে দাবি করা কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুর চালান।
এ সময় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওবায়দুল হককে মারধরের অভিযোগও ওঠে।
এরপর হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের কক্ষ ছেড়ে বাইরে চলে যেতে বলা হয়। শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে যাওয়ার পর হলের প্রধান ফটকগুলোতে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।
‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য হল তালাবদ্ধ’
হলের ফটকে তালা লাগানোর সময় উপস্থিত ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা মো. ইব্রাহীম বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই সাময়িকভাবে হল তালাবদ্ধ করা হয়েছে।
তাঁর ভাষায়,
“শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আমরা হল তালাবন্ধ করেছি। সবকিছু স্বাভাবিক হলে পরে আবার খুলে দেওয়া হবে।”
উভয় পক্ষের আহতের ভিন্ন দাবি
সংঘর্ষে আহতের সংখ্যা নিয়ে দুই সংগঠনই ভিন্ন তথ্য দিয়েছে।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক দাউদ খান দাবি করেন, সংঘর্ষে তাঁদের অন্তত ২৫ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ছাত্রদল ও যুবদলের হামলায় তাঁদের কর্মী ফুয়াদ গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁর মাথায় ১২টি সেলাই দিতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা শাখা ছাত্রদলের নেতা সাদ চৌধুরী বলেন, সংঘর্ষে তাঁদের ৩০ জনের বেশি নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।
তাঁর দাবি, ছাত্রশিবিরের হামলায় ছাত্রদল ও যুবদলের অন্তত দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
তবে উভয় পক্ষের আহতের সংখ্যা এবং অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কীভাবে শুরু হয় উত্তেজনা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
এর প্রভাব পরে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
দুপুরের দিকে প্রথম দফায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। ওই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন।
পরে ছাত্রদল মাদ্রাসার বাইরে এবং ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা মাদ্রাসার ভেতরে অবস্থান নেন।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সংঘর্ষের জন্য দুই সংগঠনই একে অপরকে দায়ী করেছে।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা শাখার সভাপতি আবদুল আলিম অভিযোগ করেন, দুপুরের দিকে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা হলে প্রবেশ করে ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মারধর করেন এবং কয়েকটি কক্ষে তালা লাগিয়ে দেন। পরে ছাত্রশিবিরের কর্মীরা তাঁদের হল থেকে বের করে দিলে ছাত্রদল পুনরায় দলবল নিয়ে এসে হামলা চালায়।
অন্যদিকে ছাত্রদল নেতা সাদ চৌধুরী দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ছাত্রশিবির হলের একাধিক কক্ষ দখল করে রেখেছে। আগের রাতে বহিরাগতদেরও হলে রাখা হয়েছিল বলে তাঁর অভিযোগ।
তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবার ছাত্রশিবির ছাত্রদলের একটি কক্ষে তালা লাগিয়ে দেয়। এর জেরে ছাত্রদলও কয়েকটি কক্ষে তালা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্র
বিকেল প্রায় সোয়া ৫টার দিকে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়।
প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে মাদ্রাসার সামনের সড়কে দুই পক্ষ ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষ চলাকালে সাত থেকে আটটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। সংঘর্ষের বিভিন্ন পর্যায়ে ছাত্রশিবিরের চারজন এবং ছাত্রদল ও যুবদলের দুজনকে মারধরের ঘটনাও দেখা যায়।
পুলিশের উপস্থিতি, তবু থামেনি সংঘর্ষ
দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আগে পুলিশ সদস্যরা দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নেন। তবে শুরুতে সদস্যসংখ্যা কম থাকায় সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা ব্যর্থ হন।
পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও সন্ধ্যা পর্যন্ত পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলতে থাকে।
অবশেষে সন্ধ্যা ৬টার দিকে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা এলাকা ত্যাগ করলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। এর পরপরই ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা হলে প্রবেশ করেন।
উত্তেজনা অব্যাহত
মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত আলিয়া মাদ্রাসা এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল।
এদিকে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ এবং অধ্যক্ষকে মারধরের অভিযোগের ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছে কি না বা কাউকে আটক করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে রাত পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পুলিশ।
ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং সংঘর্ষের দায় নির্ধারণে তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ।