ঢাকা

গণ-অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে নাহিদ: শিক্ষার্থী ও এনসিপির ভূমিকা নিয়েই বিএনপির অস্বস্তি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, শিক্ষার্থী ও নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা না থাকলে বিএনপি পুরো আন্দোলনের কৃতিত্ব এককভাবে দাবি করতে পারত।

মঙ্গলবার রাজধানীর আফতাবনগরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘From Resistance to Victory: Legacy of July’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় ছাত্রশক্তি সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

‘জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিতে পারেনি বিএনপি’

বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিএনপি নেতৃত্ব দিতে পারেনি। তাঁর দাবি, শুধু জুলাই আন্দোলন নয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে সংঘটিত কোনো গণ-আন্দোলনেই বিএনপি এককভাবে নেতৃত্ব দেয়নি; বরং বিভিন্ন আন্দোলনের রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে দলটি উপকৃত হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে আন্দোলনের ইতিহাসকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে, যা প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহকে আড়াল করছে।

নাহিদের ভাষায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং এনসিপিসহ বিভিন্ন নতুন রাজনৈতিক শক্তির অবদান বিএনপির জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘লন্ডন বা শিলং থেকে আন্দোলনের পরিকল্পনা হয়নি’

আলোচনা সভায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রচারিত বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থান লন্ডন বা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং থেকে পরিকল্পনা করে পরিচালিত হয়েছে—এমন প্রচারণা আন্দোলনের প্রকৃত নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণকারীদের অবদানকে অস্বীকার করার শামিল।

তিনি বলেন, যারা রামপুরা, বাড্ডা, বারিধারাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাজপথে থেকে আন্দোলন সংগঠিত করেছেন, তাঁদের ভূমিকাই ছিল এই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি।

‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি বলেও অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।

তিনি বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দমন-পীড়ন শুরু হওয়ার পর এবং সেগুলো বন্ধ হয়ে গেলে ১৮ জুলাই থেকে ঢাকার রাজপথে আন্দোলনের নেতৃত্ব ধরে রেখেছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

নাহিদ ইসলামের দাবি, ওই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ২৬ জন শিক্ষার্থী শহীদ হন। কিন্তু তাঁদের আত্মত্যাগ ও ঐতিহাসিক অবদান এখনো যথাযথভাবে সংরক্ষণ কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করা হয়নি।

ক্যাম্পাসে সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আবারও সন্ত্রাস, দখলদারত্ব এবং সহিংসতার মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে।

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান হয়নি’

আলোচনা সভায় এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পরও দেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটেনি।

তাঁর ভাষায়, শুধু ক্ষমতার চেয়ারে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোগত অনেক সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকারের সময় তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে, যার প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়েছে।

গুম কমিশনের খসড়া আইন নিয়ে সমালোচনা

আসিফ মাহমুদ গুম কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল এবং নতুন খসড়া আইনেরও সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব যদি আবার পুলিশের কাছেই দেওয়া হয় এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়, তাহলে তা কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে ভুক্তভোগীদের নিরুৎসাহিত করবে।

তাঁর মতে, এ ধরনের বিধান ন্যায়বিচারের পরিবর্তে একটি ‘প্রহসনে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শেখ হাসিনাকে নিয়ে মন্তব্য

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়েও মন্তব্য করেন আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, প্রথমে বলা হয়েছিল শেখ হাসিনা সরাসরি সামনে আসবেন, পরে বলা হয় তিনি অনলাইনে বক্তব্য দেবেন, এরপর শোনা যায় শুধু তাঁর বক্তব্য শোনানো হবে।

এ প্রসঙ্গে তিনি রাজনৈতিক ব্যঙ্গ করে বলেন, আগে ছাত্রলীগ বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলত, ‘দেখা না দিলে বন্ধু কথা কইও না।’ এখন সেই একই কথা আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আরও যারা বক্তব্য দেন

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান, সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার, জাতীয় ছাত্রশক্তি সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক নূর আলম হাসান এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলামের ভাই আবুল কালাম

বিএনপির প্রতিক্রিয়া মেলেনি

অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ যে অভিযোগ ও রাজনৈতিক মন্তব্য করেছেন, সে বিষয়ে বিএনপির কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব, অবদান এবং রাজনৈতিক কৃতিত্ব নিয়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে যে বিতর্ক চলছে, এই বক্তব্যগুলো সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স