জাতীয় নিরাপত্তা, সাইবার প্রতিরক্ষা ও অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যের বোর্নমাউথ বিশ্ববিদ্যালয় নতুন দুটি বিশেষায়িত কোর্স চালু করতে যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (MoD) বিশ্ববিদ্যালয়টিকে প্রায় ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন পাউন্ড অনুদান দিয়েছে।
আগামী সেপ্টেম্বর থেকে চালু হতে যাওয়া কোর্স দুটি হলো সাইবার ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এবং অটোনোমাস সিস্টেমস। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, এসব কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কেবল শ্রেণিকক্ষভিত্তিক তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং বাস্তবসম্মত পরিস্থিতিতে সাইবার হামলা মোকাবিলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবহারিক দক্ষতাও অর্জন করবে।
এই উদ্যোগের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি আধুনিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সুবিধা গড়ে তোলা হবে। এর একটি হবে সাইবার প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা প্রশিক্ষণের জন্য এবং অন্যটি হবে ড্রোন, এআই ও স্বয়ংক্রিয় যানবাহন নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষার জন্য।
সাইবার হামলা মোকাবিলায় বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ
নতুন সাইবার ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স কোর্সের অন্যতম লক্ষ্য হবে শিক্ষার্থীদের সাইবার হামলা শনাক্ত, বিশ্লেষণ এবং প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করা।
এই কোর্সের শিক্ষার্থীরা ডরসেট ইনোভেশন পার্কে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৈরি একটি বিশেষায়িত কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাবে। সেখানে সাইবার হামলার বিভিন্ন পরিস্থিতি সিমুলেশনের মাধ্যমে তৈরি করা হবে। শিক্ষার্থীরা সেই পরিবেশে সম্ভাব্য হামলার ধরন শনাক্ত করা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নেবে।
বর্তমান সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান, সামরিক অবকাঠামো, জ্বালানি ব্যবস্থা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্রমবর্ধমানভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠায় সাইবার নিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে সাইবার হামলা প্রতিরোধে দক্ষ জনবলের চাহিদাও বাড়ছে।
বোর্নমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কোর্সটি সেই বাড়তে থাকা চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই নেওয়া একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ড্রোন ও এআই প্রযুক্তিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ
অন্যদিকে অটোনোমাস সিস্টেমস কোর্সে গুরুত্ব দেওয়া হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন এবং বিভিন্ন ধরনের স্বয়ংক্রিয় যানবাহনের ওপর।
এই কোর্সের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যালবট ক্যাম্পাসে একটি বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করা হবে। সেখানে শিক্ষার্থীরা এআই-চালিত ড্রোন এবং অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাবে।
ল্যাবটির বিশেষত্ব হলো—শুধু ইনডোর গবেষণার মধ্যেই এর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্থল, আকাশ ও জলপথে চলাচলকারী স্বয়ংক্রিয় যান পরীক্ষা করার জন্য বিশেষ আউটডোর এলাকা তৈরি করা হবে। পাশাপাশি জলভিত্তিক প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য থাকবে পানির ট্যাংক।
স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি বাস্তব পরিবেশে কীভাবে কাজ করে, সেটি যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিও তৈরি করা হবে। এর মধ্যে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং যোগাযোগ বা সিগন্যালের বিঘ্নের মতো পরিস্থিতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু স্বাভাবিক পরিবেশে প্রযুক্তি পরিচালনার অভিজ্ঞতা নয়, বরং বাস্তব ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রশিক্ষণও পাবে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বাড়ছে এআই ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার গুরুত্ব
বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আসছে। প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় যান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডেটা বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি এখন আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এ কারণে সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তা খাতে শুধু প্রচলিত প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন জনবল নয়, একই সঙ্গে এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় দক্ষ প্রকৌশলী ও গবেষকের প্রয়োজন বাড়ছে।
বোর্নমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কোর্স দুটিতে এই প্রযুক্তিগুলোর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিকে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা খাতের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষা, প্রযুক্তি গবেষণা এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রেও কাজ করার সুযোগ পেতে পারে।
জাতীয় নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে দক্ষ জনবল তৈরির পরিকল্পনা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব মিডিয়া, সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সহ–উপাচার্য ও ডিন অধ্যাপক ক্রিস্টোস গাটজিদিস বলেন, নতুন কোর্সগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বুদ্ধিমান প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা দেওয়া হবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, উদীয়মান প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্য শুধু উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন পেশার জন্য স্নাতক তৈরি করা নয়। এর মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যও একটি দক্ষ কর্মীবাহিনী তৈরি করা হবে।
অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগকে কেবল নতুন দুটি একাডেমিক কোর্স চালুর ঘটনা হিসেবে দেখছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের কর্মবাজারের প্রয়োজনকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা শিক্ষায় ৮ কোটি পাউন্ডের সরকারি তহবিল
বোর্নমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ বৃহত্তর একটি সরকারি পরিকল্পনার অংশ। যুক্তরাজ্য সরকার প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সক্ষমতা বাড়াতে ইংল্যান্ডের ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকে মোট ৮০ মিলিয়ন পাউন্ড তহবিল দিয়েছে।
এই অর্থায়নের আওতায় বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
বোর্নমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ প্রায় ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন পাউন্ডের অর্থ মূলত নতুন কোর্স, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ অবকাঠামো এবং গবেষণা সুবিধা তৈরিতে কাজে লাগবে।
প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষার দিকে যুক্তরাজ্যের অগ্রসরতা
নতুন কোর্স ও গবেষণা অবকাঠামো তৈরির এই উদ্যোগ থেকে স্পষ্ট, যুক্তরাজ্য ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গঠনে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সাইবার হামলা মোকাবিলা থেকে শুরু করে এআই-নির্ভর ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় যান—প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিনির্ভরতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকেও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
বোর্নমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন দুটি কোর্স সেই পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ। সেপ্টেম্বর থেকে কোর্সগুলো চালু হলে শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন সাইবার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতার ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করবে, অন্যদিকে এআই ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও কাজ করার সুযোগ পাবে।
ফলে উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি গবেষণা এবং জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা খাতের জন্য দক্ষ জনবল তৈরির ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ যুক্তরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।