আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে শনিবার সন্ধ্যায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে কে প্রার্থী হবেন, তা চূড়ান্ত করতে ১১–দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক ডাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠক শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জামায়াত জানায়, আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে নির্বাহী পরিষদ। পরে সর্বসম্মতভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ লক্ষ্যে রোববার ১১–দলীয় ঐক্যের শীর্ষ বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি ওই বৈঠকেই চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াতের অংশ নেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, দলটি এককভাবে প্রার্থী দেবে, নাকি ১১–দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে একজন যৌথ প্রার্থী দেওয়া হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। রোববারের বৈঠকেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসার কথা।
নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে আরও যেসব বিষয়
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছাড়াও শনিবারের নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার, ১১–দলীয় ঐক্যের ঘোষিত রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সমসাময়িক বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয় বৈঠকে স্থান পায়।
দলটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনই বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে সামনে এসেছে। জামায়াত এখন বিরোধী রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রার্থী চূড়ান্ত করার পথে এগোচ্ছে।
কেন এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। গুরুতর স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। স্পিকার সেটি গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হবে। ফলে প্রার্থী চূড়ান্ত করা থেকে শুরু করে মনোনয়ন ও নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে খুব বেশি সময় নেই।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররা সরাসরি ভোট দেন না। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও রাজনৈতিক জোটগুলোর সমঝোতা নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১১–দলীয় ঐক্যের বৈঠকেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
জামায়াতের শনিবারের সিদ্ধান্তের পর এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ১১–দলীয় ঐক্যের শীর্ষ বৈঠক। রোববারের বৈঠকে জোটের শরিক দলগুলো রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা করবে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিরোধী দলের প্রার্থী কে হবেন, সেটি ওই বৈঠকেই চূড়ান্ত করা হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াতের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত হলেও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জোটগত সমঝোতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এতে একক প্রার্থী দেওয়ার মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে কি না, সেটিও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে জোটের প্রার্থী চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তির নামকে আনুষ্ঠানিক প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
বিএনপির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াতের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিএনপির অবস্থানও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা।
গত ১ আগস্ট বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়।
এর ফলে বিএনপি কাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেবে, সেটি নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নতুন রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য নাম নিয়ে দলটির ভেতরে একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে।
আলোচনায় মির্জা ফখরুলসহ একাধিক নাম
বিএনপির সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি নজরুল ইসলাম খান, আবদুল মঈন খান এবং খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় কেউ কেউ বিবেচনা করছেন।
তবে এসব নামের কোনোটিই এখন পর্যন্ত বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন কার ভাগ্যে জুটবে, তা নির্ভর করছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর।
বিএনপির দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যাচ্ছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নয়, বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং দল ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকাও আগের তুলনায় ছোট হয়ে এসেছে।
রাষ্ট্রপতি পদে সমঝোতার রাজনীতি
রাষ্ট্রপতি পদটি সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার বড় অংশ প্রধানমন্ত্রীর হাতে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, তার বড় অংশই রাজনৈতিক প্রতীক ও সাংবিধানিক ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত।
এ অবস্থায় বিএনপি ও ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী আলাদা হলে নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে। আবার রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে একক প্রার্থী নির্ধারণ হলে নির্বাচনের ফল অনেকটাই আগেই স্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।
জামায়াতের সিদ্ধান্তের পর রোববারের ১১–দলীয় বৈঠক তাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। জোটটি শেষ পর্যন্ত কাকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেয় এবং বিএনপি সেই প্রার্থীর বিপরীতে আলাদা প্রার্থী দেয় কি না—এই দুই সিদ্ধান্তই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে পরবর্তী রাজনৈতিক চিত্র নির্ধারণ করতে পারে।
সংবিধান সংস্কারের আলোচনাও সামনে
জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছাড়াও সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সংবিধান সংস্কার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যও রয়েছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে বলে জানানো হলেও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গে সংবিধান সংস্কার ইস্যুর কোনো সরাসরি যোগসূত্রের কথা দলটি জানায়নি।
তবে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় এই সংস্কার-আলোচনা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা, সংসদীয় ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন রাষ্ট্রপতি পদটিও আলোচনায় আসতে পারে।
সামনে এখন প্রার্থী চূড়ান্ত করার পালা
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক জোটের অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো—১১–দলীয় ঐক্য কাকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেয় এবং সেই প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড় করায় কি না।
রোববারের বৈঠক থেকে এ বিষয়ে পরিষ্কার সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর নির্ধারিত নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। একদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে বিরোধী জামায়াতে ইসলামী ১১–দলীয় ঐক্যের মাধ্যমে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
২০ আগস্টের ভোটের আগে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী বাছাই এবং জোটগত সমঝোতা। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তা নির্ধারিত হলেই পরিষ্কার হবে এই নির্বাচনের প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার চিত্র।