ঢাকা

‘ভারতীয় আগ্রাসনের চিত্র রাখতে বিএনপি হয়তো ভয় পাচ্ছে’—নাহিদ ইসলাম

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করে সেখানে থাকা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

তিনি অভিযোগ করেছেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং ভারতবিরোধী আন্দোলনের যেসব ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, সেগুলোর কিছু স্মৃতি ও উপকরণ বর্তমান প্রদর্শনীতে নেই। তাঁর দাবি, আগে জাদুঘরের পরিকল্পনায় সীমান্ত হত্যার একটি আলাদা অংশ, ফেলানী হত্যাকাণ্ডের স্মারক এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের কিছু ছবি ও স্মৃতি ছিল; সেগুলো পরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি হয়তো ভারতকে ভয় পাচ্ছে।’ তাঁর প্রশ্ন, যদি ভয় না থাকে, তাহলে ইতিহাসের অংশগুলো জাদুঘরে থাকবে না কেন।

শনিবার সকাল নয়টার দিকে এনসিপির অর্ধশতাধিক নেতার একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে জুলাই জাদুঘর পরিদর্শনে যান নাহিদ ইসলাম। প্রায় দেড় ঘণ্টা জাদুঘরের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখার পর সকাল সাড়ে ১০টা থেকে প্রায় আধঘণ্টা জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

সীমান্ত হত্যার অংশ সরানোর অভিযোগ

জুলাই জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুপস্থিত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, আগে জাদুঘরের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশিদের নিয়ে একটি আলাদা অংশ ছিল। সেখানে সীমান্ত হত্যার শিকার ব্যক্তিদের তালিকার পাশাপাশি ফেলানী হত্যাকাণ্ডের একটি ভাস্কর্যও থাকার কথা ছিল।

নাহিদের দাবি, এসব উপকরণ এখন আর জাদুঘরে নেই। একইভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর ও বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত মোদিবিরোধী আন্দোলনের কিছু ছবি ও স্মৃতিও সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তাঁর মতে, এসব ঘটনা শুধু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই এগুলো জাদুঘরে থাকা উচিত।

‘বিএনপি হয়তো ভারতকে ভয় পাচ্ছে’

জাদুঘরে ‘ভারতীয় আগ্রাসনের’ চিত্র না থাকার বিষয়ে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে নাহিদ ইসলাম সরাসরি বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করেন।

তিনি বলেন, বিএনপি হয়তো ভারতকে ভয় পাচ্ছে। তাঁর মতে, যদি ভয় না থাকত, তাহলে ইতিহাসের অংশগুলো জাদুঘরে রাখা হবে না কেন—এমন প্রশ্ন থেকেই যায়।

নাহিদের এই মন্তব্য মূলত জাদুঘরের বর্তমান উপস্থাপনায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং ভারতবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের পর্যাপ্ত প্রতিফলন নেই—এমন তাঁর অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে এসব উপকরণ কেন নেই বা পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের পেছনে কী কারণ রয়েছে, সে বিষয়ে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

আগের পরিকল্পনার সঙ্গে বর্তমান প্রদর্শনীর পার্থক্য

জুলাই জাদুঘর খুলে দেওয়ার দাবি নিয়ে তিনি সংসদ ও সংসদের বাইরে একাধিকবার কথা বলেছেন বলে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তিনি জাদুঘরের কার্যক্রম পরিদর্শনে এসেছিলেন। সে সময় বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও সেখানে ছিলেন বলে জানান তিনি।

নাহিদের দাবি, তখন জাদুঘরের যে পরিকল্পনা ছিল, পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেটিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে বিএনপির ওপর নির্যাতনের বিষয়ক কনটেন্ট তুলনামূলকভাবে বেশি জায়গা পেয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় বক্তব্য ও বয়ানের পরিমাণও বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তবে নাহিদ ইসলাম এটিও বলেন, জাদুঘরের প্রদর্শনী স্থির কোনো বিষয় নয়; সময়ের সঙ্গে এটি হালনাগাদ হতে থাকবে।

জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস আরও বিস্তৃত করার দাবি

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে জাদুঘরে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের যেসব অংশ বর্তমানে জাদুঘরে রাখা হয়েছে, সেগুলো আরও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ঘটনাপ্রবাহকে সময়ক্রম অনুযায়ী সাজিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বয়ান তৈরি করা উচিত।

তাঁর মতে, আন্দোলনের ইতিহাস শুধু কয়েকজন পরিচিত মুখ বা নির্দিষ্ট কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপস্থাপন করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

এ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভূমিকা আলাদাভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নাহিদ বলেন, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন জেলাতেও জুলাই আন্দোলন হয়েছে। এসব এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন, দমন–পীড়ন, প্রতিরোধ ও মানুষের অংশগ্রহণের অনেক ঘটনা রয়েছে। কিন্তু সেগুলো বর্তমান জাদুঘরে যথেষ্টভাবে উঠে আসেনি।

তাঁর অভিযোগ, প্রদর্শনীতে পরিচিত মুখগুলো বারবার এসেছে; ফলে আন্দোলনের বিস্তৃত সামাজিক ও ভৌগোলিক চিত্র পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।

জাদুঘরকে স্বায়ত্তশাসিত করার প্রস্তাব

জুলাই জাদুঘরকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে মত দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অতীতে দলীয়করণের শিকার হয়েছে। একেকটি সরকার ক্ষমতায় এসে পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসের উপস্থাপনায় পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে ইতিহাসের বয়ানও পরিবর্তিত হয়েছে।

নাহিদের মতে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত নয়।

তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান–সম্পর্কিত যেকোনো ইতিহাস, বক্তব্য ও জাদুঘরের উপস্থাপনায় জাতীয় চরিত্র থাকা প্রয়োজন। সেখানে রাজনৈতিক দলের বয়ান নয়, প্রকৃত ঘটনাই তুলে ধরা উচিত।

তাঁর ভাষায়, জাদুঘরের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘প্রকৃত সত্য’ তুলে ধরা।

অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান

জুলাই জাদুঘরে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখ করে এর ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক মানুষ জাদুঘর দেখতে আসছেন। কিন্তু বর্তমান অবকাঠামো ও জনবল দিয়ে এই চাপ সামলানো কঠিন। জাদুঘরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জাদুঘরের পরিচালনায় জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার পক্ষে মত দেন নাহিদ।

তাঁর মতে, যাঁরা গণ–অভ্যুত্থানের সঙ্গে ছিলেন এবং আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করেন, তাঁদের মাধ্যমে জাদুঘরের কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। এতে আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের সুযোগ বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

জাদুঘর নিয়ে মতামত দেওয়ার কথা

জাদুঘর পরিদর্শনের পর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন বলে জানান নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, যাঁরা জাদুঘরের দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় মতামত দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, জাদুঘরকে আরও তথ্যসমৃদ্ধ, বিস্তৃত ও জাতীয় চরিত্রসম্পন্ন করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা দরকার।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে শুধু একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা কয়েকজন নেতার কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্দোলনের সামগ্রিক সামাজিক ভিত্তি, অংশগ্রহণকারী জনগোষ্ঠী এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহকে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এনসিপির অর্ধশতাধিক নেতার অংশগ্রহণ

জুলাই জাদুঘর পরিদর্শনের সময় নাহিদ ইসলামের সঙ্গে এনসিপির অর্ধশতাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিনিধিদলে ছিলেন দলের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন ও নুসরাত তাবাসসুম, কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলম, সারোয়ার তুষার, এস এম সাইফ মোস্তাফিজ ও মাহিন সরকার।

এ ছাড়া জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার এবং চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফিসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ছিলেন।

ইতিহাসের উপস্থাপন নিয়ে নতুন বিতর্ক

জুলাই জাদুঘরকে ঘিরে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অভ্যুত্থানের ইতিহাস কীভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা হবে, সেই প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে।

একদিকে তিনি জাদুঘরে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, ফেলানী হত্যার স্মারক এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন জেলার মানুষের ভূমিকা আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার কথা বলেছেন।

একই সঙ্গে তিনি দলীয় প্রভাবের বাইরে একটি স্বায়ত্তশাসিত ও জাতীয় চরিত্রের জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

তাঁর বক্তব্যের মূল প্রশ্নটি হলো—জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ইতিহাস কি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ব্যাখ্যা ও বয়ানের মাধ্যমে উপস্থাপিত হবে, নাকি আন্দোলনের সব পক্ষ, অঞ্চল ও শ্রেণির অংশগ্রহণ এবং সংঘটিত ঘটনাগুলোকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি জাতীয় ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে।

নাহিদ ইসলামের মতে, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে যাতে জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসের বয়ানও পরিবর্তিত না হয়, সে জন্য শুরু থেকেই জাদুঘরটির স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স