গ্যাসের চাহিদা মেটাতে দ্রুত এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। আগস্টে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে আনা চারটি এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা থাকলেও সোমবার পর্যন্ত একটিও আসেনি। এসব কার্গো ঠিক কবে আসবে, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দেশে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো কেনার জন্য দরপত্র ডাকা হয়েছে। তবে সেখানেও পুরোপুরি সাড়া মেলেনি। পাঁচটির মধ্যে মাত্র দুটি কার্গোর জন্য দরপ্রস্তাব জমা পড়েছে। বাকি তিনটির জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দেয়নি।
জ্বালানি বিভাগের অনুমোদনের পর এলএনজি আমদানি ও সরবরাহের বিষয়টি তদারক করে পেট্রোবাংলা। এর আওতায় আমদানির কাজ পরিচালনা করছে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সরাসরি কেনা কার্গোগুলো সময়মতো না আসায় গ্যাসের সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আগস্টে আসার কথা ছিল নয়টি কার্গো
সাধারণ সময়ে প্রতি মাসে প্রায় ১০টি এলএনজি কার্গো দেশে আসে। তবে টার্মিনালের সমস্যার কারণে আগস্টে এই সংখ্যা নয়টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি কার্গো দরপত্রের মাধ্যমে, একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়, একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে এবং চারটি সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে আনার পরিকল্পনা ছিল।
দরপত্রের মাধ্যমে কেনা তিনটি কার্গোর মধ্যে দুটি ইতিমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে। আরেকটি ২০ আগস্ট দেশে পৌঁছানোর কথা। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকেও একটি কার্গো এসেছে।
এদিকে সৌদি আরামকোর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় একটি এলএনজিবাহী জাহাজ বঙ্গোপসাগরে এলেও টার্মিনালে স্থানান্তরের ঝুঁকি থাকায় সেটি থেকে এলএনজি নেওয়া হয়নি।
সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে আনা চারটি কার্গোর মধ্যে দুটি সরবরাহের দায়িত্ব ছিল হংকংভিত্তিক ঝেনইউ শিপিংয়ের। প্রতিষ্ঠানটি গত রোববার একটি জাহাজের তথ্য পাঠায়। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, জাহাজটি যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। এ জাহাজ গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও জাহাজের সঙ্গে বাংলাদেশের লেনদেনে জটিলতা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় সরকার সেটি গ্রহণ করেনি।
অন্য কার্গোগুলোর ক্ষেত্রেও সরবরাহের নির্দিষ্ট সময় জানায়নি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। ধারণা করা হচ্ছে, তারা সরবরাহ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার অনুমতি চাইতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সরাসরি ক্রয়াদেশ পাওয়া কয়েকটি সরবরাহকারী প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা এখনো শেষ করতে পারেনি। ফলে তাদের জাহাজ না আসায় নতুন করে দরপত্রের মাধ্যমে এলএনজি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, সরবরাহ পরিস্থিতি ধরে রাখা সম্ভব হবে।
কম দামে এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
আগস্টের শুরুতে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে যুক্তরাজ্যের ব্ল্যাককিউব ইন্টারন্যাশনাল, ওমানের ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসি এবং হংকংয়ের ঝেনইউ শিপিংয়ের কাছ থেকে মোট ছয়টি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্ল্যাককিউবের একটি কার্গো আগস্টে এবং আরেকটি সেপ্টেম্বরে, ম্যাক্সওয়েলের একটি আগস্টে ও একটি অক্টোবরে এবং ঝেনইউয়ের দুটি কার্গো আগস্টে আসার কথা ছিল।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বর্তমানে প্রতি ইউনিট ২০ ডলারের ওপরে থাকলেও সরাসরি ক্রয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কম দাম পাওয়া গেছে। আরপিজিসিএল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ব্ল্যাককিউব প্রতি ইউনিট ১৫ দশমিক ৫০ ডলার এবং ঝেনইউ ১৪ দশমিক ৯৫ ডলারে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। সোমবার বাজারদর ছিল প্রায় ২২ ডলার।
খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাজারদরের তুলনায় এত কম দামে প্রস্তাব পাওয়ার পর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, কার্গোর উৎস এবং জাহাজ সম্পর্কে আরও কঠোর যাচাই প্রয়োজন ছিল। এখন সরবরাহ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হলে বাজারদর বাড়া-কমার সুযোগে সরবরাহকারীরা সুবিধা পেতে পারে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে।
এর আগেও জ্বালানি তেলের সংকটের সময়ে সরাসরি ক্রয়াদেশ পাওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সময়মতো তেল সরবরাহ করতে পারেনি। এরপরও নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোকে দরপত্র ছাড়া এলএনজি সরবরাহের সুযোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
জরুরি দরপত্রেও পুরো সাড়া নেই
সরাসরি কেনা কার্গোগুলোর অনিশ্চয়তার মধ্যে গতকাল জরুরি ভিত্তিতে পাঁচটি এলএনজি কার্গোর জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। আগস্টে সরবরাহের জন্য তিনটি এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সরবরাহের জন্য আরও দুটি কার্গো চাওয়া হয়েছে।
২৩-২৪ আগস্ট এবং ৪-৫ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য দুটি কার্গোর দরপ্রস্তাব পাওয়া গেছে। উভয় ক্ষেত্রেই সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম। তাদের প্রস্তাবিত দাম প্রতি ইউনিট প্রায় ২২ ডলার।
তবে বাকি তিনটি কার্গোর জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়নি। এসব কার্গোর জন্য আবারও দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে।
বাংলাদেশ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও খোলাবাজার—এই দুই উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ করে। কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দুই দেশ থেকেই নিয়মিত সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। বর্তমানে তারা মাঝে মাঝে এক বা দুটি করে কার্গো পাঠাচ্ছে।
সৌদি আরামকোর সঙ্গেও সরকারি পর্যায়ে একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোবাংলার তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে দরপত্রের মাধ্যমে খোলাবাজারের এলএনজি কেনা হয়। বর্তমান সরকার তালিকা হালনাগাদ করে ২৯টি কোম্পানিকে চূড়ান্ত করেছে।
আবারও কমছে গ্যাস সরবরাহ
কক্সবাজারের মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট।
২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ২৫ দিন সংকট চলার পর গত শনিবার সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হলে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ে।
তবে নতুন কার্গো না আসায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গত দুই দিন ধরে সরবরাহ আবার কমছে। দ্রুত নতুন জাহাজ না এলে এই টার্মিনাল থেকেও সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত শুক্রবার বিকেলে দেশে গ্যাসের মোট সরবরাহ দৈনিক ১৬৪ কোটি ঘনফুটে নেমে গিয়েছিল। শনিবার রাতে তা বেড়ে ২৪২ কোটি ঘনফুট হয়। পরে রোববার ২৪০ কোটি এবং সোমবার ২২৮ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ৬৬ কোটি ঘনফুট।
শনিবারের পর গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ায় নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও হবিগঞ্জের কিছু কারখানা রোববার থেকে আবার উৎপাদনে ফিরতে শুরু করে। তবে সব শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
এসিআই লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কামরুল হাসান জানান, আগের তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা ভালো হয়েছে এবং বর্তমানে উৎপাদন মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাপ এখন সন্তোষজনক। নরসিংদীতেও সরবরাহ বেড়েছে। তবে গাজীপুরের কয়েকটি এলাকায় এখনো সমস্যা রয়েছে।
অন্যদিকে সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলসে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম জানান, স্বাভাবিক সময়ে দিনে গ্যাসের চাপ প্রায় ৫ পিএসআই এবং রাতে ১০ পিএসআই থাকলেও সোমবার প্রয়োজনীয় চাপ পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিমের মতে, সরাসরি ক্রয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা। সেই পদ্ধতিতে কেনা এলএনজিও যদি সংকটের সময়ে সময়মতো না আসে, তাহলে এমন ক্রয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাঁর পরামর্শ, ব্যর্থ সরবরাহকারীদের সময় না বাড়িয়ে চুক্তি অনুযায়ী জামানত বাজেয়াপ্ত ও কালোতালিকাভুক্ত করা উচিত। একই সঙ্গে দ্রুত দরপত্রের মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহ করে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন—প্রয়োজনে কিছুটা বেশি দাম দিয়েও।