বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে জনসম্পর্ক ও পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও জোরদারে শিক্ষা বিনিময়কে অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তাঁর মতে, দুই দেশের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে শুধু একাডেমিক সহযোগিতাই নয়, দুই দেশের মানুষের মধ্যকার সম্পর্কও আরও গভীর হবে।
মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন বাড়াতে এডুকেশন এক্সচেঞ্জ বা শিক্ষা বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা চীনে গিয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি চীনের শিক্ষার্থীদেরও বাংলাদেশে এসে সামার স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে চীনের গুয়াংঝৌর সাউথ চায়না নর্মাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত ‘চীন-বাংলাদেশ এডুকেশন এক্সচেঞ্জ সম্মেলন’-এ তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময়ে গুরুত্ব
সম্মেলনে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনও বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আরও গভীর ও সুসংগঠিত শিক্ষাগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, যৌথ গবেষণা, বৃত্তি, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময়, স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ এবং যৌথ মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামের মাধ্যমে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা গড়ে তোলা সম্ভব।
শিক্ষামন্ত্রী দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসই একাডেমিক অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠায় আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষার্থী বিনিময়ের মধ্যে সহযোগিতা সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সহযোগিতা, একাডেমিক বিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাগত অংশীদারত্ব বৃদ্ধিতে উভয় পক্ষের দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে সম্মেলনটি শেষ হয়।
চার বিষয়ে সহযোগিতার আলোচনা
এর আগে বুধবার সকালে চীন-বাংলাদেশ শিক্ষা সহযোগিতা নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দুই দেশের শিক্ষা খাতের পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সভায় মূলত চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এগুলো হলো—চীনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ বৃদ্ধি, দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার, যৌথ গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য চীনের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও বেশি সুযোগ তৈরি করা এবং বিদ্যমান সুযোগগুলোকে কীভাবে কার্যকরভাবে সম্প্রসারণ করা যায়, তা নিয়েও সভায় আলোচনা হয়।
চীনে পড়ুয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ
বিকেলের সম্মেলনে চীনের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, চীনে বর্তমানে যেসব বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন, তাঁদের একাডেমিক পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা আরও উন্নত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
চীনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু ভর্তি ও বৃত্তির সুযোগ বাড়ানো নয়, পড়াশোনার পরিবেশ, গবেষণার সুযোগ এবং একাডেমিক সহায়তার মান উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
মাহদী আমিনের মতে, চীনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। তবে এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতায় রূপ দিতে হলে শিক্ষার্থী বিনিময়ের পাশাপাশি গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
যৌথ গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে জোর
শুধু বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থী চীনে পাঠানোই যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা। তিনি দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
মাহদী আমিন বলেন, চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কাজে লাগাতে পারে। এ জন্য দুই দেশের গবেষকদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং যৌথ গবেষণা প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি ল্যাবরেটরি ও গবেষণা অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা ও পলিটেকনিক খাতে চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে তা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের শিক্ষা সহযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। দুই দেশের মেধা, গবেষণা সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর মাধ্যমে এ সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
কারিগরি শিক্ষা ও চীনা ভাষায় সহযোগিতা
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান শিক্ষাগত চাহিদার কথাও সম্মেলনে তুলে ধরেন মাহদী আমিন। তিনি চীনের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় অংশীদারত্ব এবং চীনা ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগাযোগ আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
বিশেষ করে বাংলাদেশে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহায়তায় ‘চীনা ভাষা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন তিনি। এসব কেন্দ্রে যোগ্য শিক্ষক, সুসংগঠিত কোর্স, প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশে চীনা ভাষা শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো হলে দুই দেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ একাডেমিক ও পেশাগত যোগাযোগ তৈরির ক্ষেত্রও বিস্তৃত হতে পারে।
বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ
সম্মেলনে মাহদী আমিন চীনা সরকার ও দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সফরের মাধ্যমে চীনের শিক্ষা কর্মকর্তারা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব পরিস্থিতি আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের মাধ্যমে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
এ ধরনের সফর দুই দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার বাস্তব সম্ভাবনা খুঁজে বের করতে সহায়ক হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অংশ নেন দুই দেশের শিক্ষা কর্মকর্তারা
চীন-বাংলাদেশ এডুকেশন এক্সচেঞ্জ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া।
চীনের পক্ষ থেকে সম্মেলনে অংশ নেন গুয়াংডং প্রদেশের শিক্ষা বিভাগের প্রাদেশিক প্রধান পরিদর্শক জু শিমিন, এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো-অপারেশন অফিসের উপপরিচালক ঝো লিউইউ, চীন-বাংলাদেশ শিক্ষা ও সংস্কৃতি সমিতির সহসভাপতি প্রকৌশলী শেখ কোরবান আলী, যুগ্ম সম্পাদক ওয়াং পেং এবং পরামর্শক ঝেং পেংউ।
এ ছাড়া সাউথ চায়না নর্মাল ইউনিভার্সিটির সহ-উপাচার্য অধ্যাপক ইয়াং চেংওয়েই সম্মেলনে অংশ নেন।
সম্মেলনে আলোচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা খাতে সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার বিষয়ে উভয় পক্ষের আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে। শিক্ষার্থী-শিক্ষক বিনিময় থেকে শুরু করে যৌথ গবেষণা, কারিগরি শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ উচ্চশিক্ষা কর্মসূচি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ দুই দেশের শিক্ষা সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।