আওয়ামী লীগ আমলে গুমের শিকার সব ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার দাবি এনসিপির আহ্বায়কের
বাগেরহাটের মোংলায় ‘গুমের শিকার’ জেলে মিরাজ শেখসহ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার সব ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে গুমের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত এবং গুম প্রতিরোধ আইনে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের সুস্পষ্ট বিধান রাখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
আগামীকাল ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি সামনে রেখে শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এসব দাবি জানান নাহিদ ইসলাম।
বার্তায় তিনি গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলায় কোস্টগার্ডের সদস্য পরিচয়ে এক জেলেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। নাহিদ ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় মিরাজ শেখের কোনো সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পর বিএনপি সরকারের ছয় মাসের সময়ে এটিই একমাত্র আলোচিত গুমের অভিযোগ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মিরাজসহ নিখোঁজদের সন্ধান দাবি
নাহিদ ইসলাম বলেন, মিরাজ শেখসহ গুমের শিকার সব ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে হবে। তাঁদের পরিবারের কাছে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরার পাশাপাশি গুমের প্রতিটি ঘটনার বিচার দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলো বছরের পর বছর প্রিয়জনের সন্ধানের অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁদের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে রাষ্ট্রকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
নাহিদ ইসলামের মতে, গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করাই যথেষ্ট নয়; ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে সত্য জানানোও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
‘গুমকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ার করা হয়েছিল’
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেড় দশকের ওই শাসনামলে বাংলাদেশে গুমকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের একটি ভয়াবহ হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
তাঁর দাবি, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এই নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বিরোধী দল ও ভিন্নমতের অসংখ্য নাগরিক। তাঁদের অনেকে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং স্বজনেরা বছরের পর বছর তাঁদের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, গুমের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত ঘটনাগুলোর প্রকৃত চিত্র প্রকাশ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করা জরুরি। একই সঙ্গে এসব ঘটনার দায় নির্ধারণ করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
‘আয়নাঘরে’ নির্যাতনের অভিযোগ
বার্তায় গুমের অভিযোগের সঙ্গে কথিত ‘আয়নাঘর’-এর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন এনসিপির আহ্বায়ক।
তিনি বলেন, ‘আয়নাঘর’ নামের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে অসংখ্য মানুষকে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ভাষায়, এসব ঘটনা বিশ্বমানবতাকে লজ্জিত করে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও তাঁদের প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকুতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই পরিবারগুলোর বেদনার ওপর দাঁড়িয়েই ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তবে তাঁর অভিযোগ, আন্দোলন-পরবর্তী বাংলাদেশেও অনেক পরিবার এখনো তাঁদের নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান পায়নি।
মোংলার মিরাজ শেখের গুমের অভিযোগও তাঁকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে বলে জানান নাহিদ ইসলাম।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে প্রশ্ন
বর্তমান সরকারের সংসদে উত্থাপিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, অতীতে গুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হলেও বর্তমানে সংসদে উত্থাপিত এসব আইনগত উদ্যোগে গুমের মতো গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাঁর মতে, গুমের প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা না গেলে দেশে গুমের সংস্কৃতির স্থায়ী অবসান সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, তদন্তপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রভাব বা পক্ষপাত থাকলে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা কঠিন হবে। তাই গুম প্রতিরোধ আইনে অভিযোগ তদন্তের জন্য স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর কাঠামোর সুস্পষ্ট বিধান থাকা প্রয়োজন।
স্বাধীন তদন্তের ওপর জোর
নাহিদ ইসলামের অন্যতম প্রধান দাবি হলো—গুমের অভিযোগের তদন্তে স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, গুমের প্রতিটি অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত করতে হবে। কোনো অভিযোগকে রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্য কোনো বিবেচনায় উপেক্ষা করা যাবে না।
গুম প্রতিরোধ আইনে এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত শুরু করা যায় এবং তদন্তকারী সংস্থা প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে।
একই সঙ্গে তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পথও নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
পরিবারগুলোর অপেক্ষার অবসান চাইলেন
গুমের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয় নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার। বছরের পর বছর কোনো তথ্য না পেয়ে অনেক পরিবার অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, গুমের শিকার প্রতিটি মানুষের পরিবারের কান্নার জবাব রাষ্ট্রকে দিতে হবে। তাঁদের প্রিয়জনের কী হয়েছে, সে বিষয়ে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে তথ্য দেওয়া এবং তাঁদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
‘গুমের সংস্কৃতি আর ফিরে আসতে দেওয়া যাবে না’
দেশে ভবিষ্যতে যেন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুমের সংস্কৃতি ফিরে না আসে, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।
তাঁর মতে, গুমের বিরুদ্ধে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; আইন বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামোও প্রয়োজন।
তিনি বলেন, অতীতের গুমের ঘটনাগুলোর সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিচার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা কঠিন হবে।
এ কারণে গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান, ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বান
নাহিদ ইসলাম বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তাঁদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রকে প্রতিটি ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির মধ্য দিয়েই একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রাক্কালে নাহিদ ইসলামের এই বার্তায় তাই একদিকে মিরাজ শেখসহ নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত সন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে, অন্যদিকে গুমের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, অতীত ও বর্তমান—সব গুমের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে সত্য তুলে ধরতে হবে এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুমের কোনো সুযোগ যেন তৈরি না হয়, সে জন্য কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথাও বলেছেন তিনি।