নেপালে হিমবাহধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ভয়াবহতা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক মার্কিন দম্পতি। পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণের সময় আকস্মিকভাবে নেমে আসা কাদা, পাথর ও পানির প্রবল স্রোত তাঁদের চোখের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে। তাঁদের ভাষায়, পাহাড় বেয়ে ধেয়ে আসা সেই স্রোত দেখতে অনেকটা ‘সুনামি’র মতো ছিল।
বেঁচে যাওয়া ওই দম্পতি হলেন ৫২ বছর বয়সী অঞ্জনা রাজা ও ৫৬ বছর বয়সী পট্টাভিরামন ভেঙ্কটেশন। নেপালে পেশাদার গাইডের সঙ্গে ভ্রমণে থাকা অবস্থায় তাঁরা এই দুর্যোগের কবলে পড়েন। কাঠমান্ডুতে সিএনএনের প্রতিনিধি উইল রিপলিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁরা তাঁদের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।
দম্পতিটি জানান, দুর্যোগ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি এত দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য তাঁদের হাতে খুব বেশি সময় ছিল না। তবে সঙ্গে থাকা গাইডের দ্রুত সিদ্ধান্ত ও তৎপরতার কারণেই শেষ পর্যন্ত তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান।
‘পাহাড় বেয়ে সুনামির মতো ধেয়ে আসছিল’
অঞ্জনা রাজা ও পট্টাভিরামন ভেঙ্কটেশন নেপালের পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণের সময় হঠাৎ করে প্রবল স্রোত নেমে আসতে দেখেন। পাহাড়ের ওপর থেকে কাদা, পানি ও পাথর একসঙ্গে নিচের দিকে ধেয়ে আসছিল।
দম্পতির বর্ণনায়, স্রোতের গতি এতটাই বেশি ছিল যে সেটিকে সাধারণ পাহাড়ি বন্যা বলে মনে হচ্ছিল না। বরং বিশাল কোনো ঢেউ পাহাড় বেয়ে নেমে আসছে—এমন অনুভূতি হচ্ছিল তাঁদের।
তাঁরা জানান, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে তাঁদের গাইড দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। বন্যার পানির সম্ভাব্য গতিপথ থেকে তাঁদের সরিয়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় নিয়ে যান তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই নিচের এলাকা কাদা ও পানির প্রবল স্রোতে ডুবে যায়।
দম্পতির মতে, গাইড যদি সেই মুহূর্তে দ্রুত ব্যবস্থা না নিতেন, তাহলে তাঁদেরও পরিণতি ভয়াবহ হতে পারত।
প্রাণে বাঁচলেও ভয়াবহতার সাক্ষী
নেপালের হিমালয়ঘেঁষা এলাকায় ভ্রমণ করতে গিয়ে তাঁরা যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, তা তাঁদের কাছে দীর্ঘদিনের জন্য ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে থাকবে।
পাহাড়ি অঞ্চলে সাধারণত বন্যা বা ভূমিধসের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় মানুষের হাতে খুব কম সময় থাকে। বিশেষ করে হিমবাহ বা হিমবাহ-হ্রদ থেকে বিপুল পরিমাণ পানি হঠাৎ নেমে এলে নদীর গতিপথ ও আশপাশের ভূপ্রকৃতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
এই দম্পতির ক্ষেত্রেও বিপদের মূল কারণ ছিল আকস্মিকতা। তাঁরা এমন একটি এলাকায় ছিলেন, যেখানে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিক পরিবেশ ভয়াবহ স্রোতে পরিণত হয়।
তাঁদের বেঁচে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় গাইডদের ভূমিকার বিষয়টিও সামনে এসেছে। পাহাড়ি এলাকার ভূপ্রকৃতি, নদীর গতিপথ ও সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে স্থানীয় অভিজ্ঞতা অনেক সময় পর্যটকদের তুলনায় গাইডদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
নিহত ৫৪৭, নিখোঁজ প্রায় এক হাজার
এদিকে নেপালে এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ হিসাবে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪৭। আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৪৭৩ জন।
এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৯৭৭ জন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৫১৭ জনই বিদেশি নাগরিক। ফলে দুর্যোগটির প্রভাব শুধু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; নেপালে ভ্রমণরত বিপুলসংখ্যক বিদেশিও এর শিকার হয়েছেন।
নেপালের পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অঞ্জনা রাজা ও পট্টাভিরামন ভেঙ্কটেশনসহ ১২১ জন বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
তবে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো নিখোঁজ থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাজারো উদ্ধারকর্মী মাঠে
দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করেছে নেপাল সরকার। দেশটির পুলিশের সাড়ে চার হাজারের বেশি সদস্য উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন।
পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় আরও ১ হাজার ২০০ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সেনা ও পুলিশের সদস্যরা নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার এবং দুর্গম এলাকায় প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছেন।
উদ্ধারকাজে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও যুক্ত হয়েছে। চীনের একটি উদ্ধারকারী দল তিব্বত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মূল এলাকায় পৌঁছেছে এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে।
তবে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, কাদা ও ধ্বংসস্তূপ এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকারীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেও বাড়তি সময় লাগছে।
এক বছরের মধ্যে একই ধরনের দুর্যোগ
নেপালের এই বিপর্যয়কে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। কারণ, ২০২৫ সালের আগস্টেও একই অঞ্চলে প্রায় একই ধরনের আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেছিল।
সে সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে তিব্বতের একটি হিমবাহ-হ্রদ উপচে পড়েছিল। হিমবাহ-হ্রদের পানি আকস্মিকভাবে নিচের দিকে নেমে আসায় সৃষ্ট বন্যায় অন্তত নয়জন নিহত হন।
ওই দুর্যোগে নেপাল ও চীনের মধ্যে যোগাযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুসহ বেশ কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
এক বছরের ব্যবধানে একই ধরনের বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি হিমালয় অঞ্চলের পরিবর্তিত জলবায়ু ও হিমবাহ-সংক্রান্ত ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাহাড়ি এলাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে হিমবাহ দ্রুত গলতে পারে এবং হিমবাহ-হ্রদে পানির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। কোনো প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে সেই পানি অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল গতিতে নিচের দিকে নেমে ভয়াবহ বন্যা তৈরি করতে পারে।
পর্যটননির্ভর নেপালে নতুন উদ্বেগ
নেপালের অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্বতারোহণ ও ট্রেকিং গন্তব্য হওয়ায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক দেশটিতে যান।
কিন্তু সাম্প্রতিক এই দুর্যোগে বিদেশি নাগরিকদের বিপুলসংখ্যায় নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নেপালের পর্যটন নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং হিমবাহ-হ্রদের পানি নেমে আসার মতো ঝুঁকি পর্যটকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। এ ধরনের এলাকায় আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতির দ্রুত পরিবর্তন সম্পর্কে পর্যটকদের আগাম সতর্ক করা এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
অঞ্জনা রাজা ও পট্টাভিরামন ভেঙ্কটেশনের বেঁচে যাওয়ার ঘটনাটি তাই শুধু একটি দম্পতির সৌভাগ্যের গল্প নয়; এটি হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ কত দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তারও একটি বাস্তব উদাহরণ।
পাহাড়ের ওপর থেকে কাদা ও পানির স্রোত যখন ‘সুনামি’র মতো নেমে আসছিল, তখন একজন অভিজ্ঞ গাইডের কয়েকটি দ্রুত সিদ্ধান্তই তাঁদের জীবন বাঁচিয়েছে। কিন্তু তাঁদের মতো ভাগ্যবান হতে পারেননি শত শত মানুষ। এখনো নিখোঁজ প্রায় এক হাজার মানুষকে খুঁজে বের করাই নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।