ঢাকা

রুশ হামলায় ইউক্রেনের গ্রন্থাগার ও বইয়ের ব্যাপক ক্ষতি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
কিয়েভের উপকণ্ঠে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি ছাপাখানার সামনে দাঁড়িয়ে শূন্য দৃষ্টিতে ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে ছিলেন ভিক্টোরিয়া হাইদাই। নতুন শিক্ষাবর্ষ সামনে রেখে যেখানে দিন-রাত ব্যস্ত থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন পড়ে আছে পোড়া কাগজ, ভেঙে পড়া যন্ত্রপাতি আর ছাই।

রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় লন্ডভন্ড হয়ে গেছে ইউক্রেনের ওই ছাপাখানা। হামলার সময় সেখানে নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য বিপুলসংখ্যক পাঠ্যবই ছাপার কাজ চলছিল। এক হামলাতেই নষ্ট হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ বই, যা ইউক্রেনের স্কুলগুলোতে ব্যবহৃত মোট পাঠ্যবইয়ের প্রায় ১০ শতাংশ।

ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পাওয়া গেছে ইংরেজি ভাষার একটি পাঠ্যবইয়ের পোড়া পৃষ্ঠা। ছাইয়ের মধ্যে পড়ে থাকা সেই পাতায় লেখা ছিল, ‘আমার নাম উইলিয়াম। আমার বাড়ি যুক্তরাজ্যে। আমার দাদি নটিংহামে থাকেন। এটি একটি সুন্দর শহর।’

একটি স্কুলের শিশুর হাতে পৌঁছানোর কথা ছিল যে বইয়ের, সেটিই এখন যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের প্রতীক হয়ে পড়ে আছে।

ধারাবাহিক হামলায় বিপর্যস্ত প্রকাশনাশিল্প

ইউক্রেনজুড়ে ছাপাখানা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ওপর সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক হামলা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বই নষ্ট হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু নতুন বই ছাপার প্রতিষ্ঠান নয়, বই সংরক্ষণ ও সরবরাহের কেন্দ্রগুলোও হামলার শিকার হয়েছে। ফলে ছাপাখানায় বই উৎপাদন করলেও সেগুলো পাঠক বা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর ইউক্রেনে ছাপা হওয়া মোট বইয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই রুশ হামলায় ধ্বংস হয়েছে।

কিয়েভের উপকণ্ঠের ক্ষতিগ্রস্ত ছাপাখানাটিতে আগুন নেভানোর পরও উদ্ধার করার মতো তেমন কিছু অবশিষ্ট ছিল না। আগুন থেকে কোনোভাবে বেঁচে যাওয়া বইয়ের পাতাগুলোও অগ্নিনির্বাপণের পানি ও দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কনভির বাণিজ্যিক পরিচালক ভিক্টোরিয়া হাইদাই মনে করেন, এসব হামলা নিছক দুর্ঘটনা নয়।

তিনি বলেন, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবেই এসব করছে বলে তিনি মনে করেন। গত দুই মাসে ইউক্রেনের কয়েকটি বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকেন্দ্র হামলায় ধ্বংস হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক বই মজুত ছিল।

হাইদাইয়ের ভাষায়, ইউক্রেনীয় জাতিকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে রাশিয়া। সেই কারণেই ছাপাখানাগুলোকে ধ্বংস করা হচ্ছে। তবে তাঁর বিশ্বাস, এ প্রচেষ্টা সফল হবে না।

৩৫টির বেশি প্রকাশনা ও মুদ্রণ স্থাপনায় হামলা

গত কয়েক সপ্তাহেই ইউক্রেনের ৩৫টির বেশি প্রকাশনা ও মুদ্রণ স্থাপনায় হামলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে শুধু বই উৎপাদনের সক্ষমতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং প্রকাশনা খাতের সরবরাহব্যবস্থাও বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।

কিয়েভের পুরোনো বইয়ের বাজারও হামলা থেকে রেহাই পায়নি। সেখানে শত শত বিক্রয়কেন্দ্র এবং বিপুলসংখ্যক মূল্যবান বই ধ্বংস হয়েছে।

ফলে যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু বই প্রকাশের ওপর সীমাবদ্ধ নেই। লেখক, প্রকাশক, মুদ্রণকর্মী, বই বিক্রেতা থেকে শুরু করে পাঠক—প্রকাশনাশিল্পের প্রায় প্রতিটি স্তরই সংকটে পড়েছে।

বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থায় এর প্রভাব আরও গভীর। নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যবই সময়মতো ছাপা ও সরবরাহ করা না গেলে যুদ্ধের কারণে এমনিতেই ব্যাহত শিক্ষাব্যবস্থা আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।

ধ্বংসস্তূপে বই উদ্ধারের চেষ্টা

কিয়েভের ওই ছাপাখানায় আগুন পুরোপুরি নেভানোর কাজ শেষ হওয়ার আগেই সেখানে পৌঁছেছিলেন ২৮ বছর বয়সী বইবিষয়ক ব্লগার লিলিয়া ভেলিকা।

তিনি জ্বলতে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে যতটা সম্ভব বই উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে উঠে আসে পানিতে ভিজে যাওয়া একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির বই।

লিলিয়ার কাছে বই কেবল কাগজে ছাপা কিছু পৃষ্ঠা নয়। তাঁর ভাষায়, বই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই বই হারানো মানে তাঁদের হৃদয়ের একটি অংশ হারিয়ে ফেলার মতো।

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে তাঁর এই বই উদ্ধারের চেষ্টা ইউক্রেনের প্রকাশনা খাতের বর্তমান বাস্তবতার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। যেখানে একদিকে রুশ হামলায় বই পুড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ সাধ্যমতো সেগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।

শুধু বই নয়, ঝুঁকিতে ইউক্রেনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

যুদ্ধের প্রভাব ইউক্রেনের প্রকাশনাশিল্পের বাইরেও বিস্তৃত। দেশটির বিভিন্ন জাদুঘর, আর্ট গ্যালারি, চলচ্চিত্র স্টুডিও, গ্রন্থাগার ও অপেরা হাউস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইউক্রেনের সংস্কৃতিমন্ত্রী তেতিয়ানা বেরেজনা অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া দেশটির দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতীক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের ১ হাজার ৯০০-এর বেশি ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন এবং ২ হাজারের বেশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুদ্ধের ময়দানে সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোর পাশাপাশি একটি দেশের ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ওপর আঘাতের অভিযোগ তাই ইউক্রেনের কাছে আলাদা তাৎপর্য বহন করছে।

সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, এমন পরিস্থিতিতে শিল্প ও সাহিত্যকে টিকিয়ে রাখা এবং শিশুদের পড়াশোনা চালু রাখার জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

এর মাধ্যমে অন্তত কিছু ক্ষেত্রে ধ্বংস হওয়া বই, নথি ও সাংস্কৃতিক উপকরণের ডিজিটাল সংস্করণ সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কাছে মুদ্রিত বইয়ের বিকল্প হিসেবে ডিজিটাল পাঠ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

প্রকাশনাশিল্প টিকিয়ে রাখতে আন্তর্জাতিক সহায়তার দাবি

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনের পুরো প্রকাশনাশিল্পই এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। একের পর এক ছাপাখানা, গুদাম, সরবরাহকেন্দ্র ও বই বিক্রয়কেন্দ্র ধ্বংস হওয়ায় এই শিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, প্রকাশনাশিল্প শুধু বই ছাপার সঙ্গে যুক্ত নয়; এর সঙ্গে কাগজ, ছাপার যন্ত্র, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, বিপণন ও খুচরা বিক্রির মতো বহু খাত জড়িত। একটি অংশ ধ্বংস হলে পুরো ব্যবস্থার ওপর তার প্রভাব পড়ে।

বিশেষ করে স্কুলপাঠ্যবইয়ের ক্ষেত্রে ক্ষতির মাত্রা আরও গুরুতর। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়া না গেলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রকাশনা খাতকে টিকিয়ে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

রাশিয়ার পাল্টা দাবি

তবে ইউক্রেনের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়া। যুক্তরাজ্যে অবস্থিত রুশ দূতাবাস বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের জন্য উল্টো ইউক্রেন সরকারকেই দায়ী করেছে।

রুশ দূতাবাসের দাবি, ইউক্রেন নিজেরাই তাদের পুরোনো স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলছে এবং বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তন করছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় বাহিনী সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্র লুকিয়ে রাখার জন্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেছে তারা।

ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই রাশিয়া বলে আসছে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় না।

তবে ইউক্রেনের অভিযোগ, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, ছাপাখানা, বইয়ের গুদাম, গ্রন্থাগারসহ সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলোতে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা তাদের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর বড় আঘাত। দেশটির কর্মকর্তাদের মতে, এসব স্থাপনা ধ্বংসের প্রভাব তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির বাইরে বহু বছর পর্যন্ত থাকবে।

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে টিকে থাকার লড়াই

একটি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সাধারণত নিহত মানুষ, ধ্বংস হওয়া ভবন কিংবা সামরিক সরঞ্জামের হিসাব দিয়ে মাপা হয়। কিন্তু ইউক্রেনের প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলা দেখিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধ একটি দেশের জ্ঞান, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে।

কিয়েভের ধ্বংস হয়ে যাওয়া ছাপাখানার ছাইয়ের মধ্যে পড়ে থাকা পোড়া পাঠ্যবইয়ের পাতাটি তাই কেবল একটি বই হারানোর গল্প নয়। নতুন শিক্ষাবর্ষে একটি শিশুর হাতে পৌঁছানোর কথা ছিল যে বইয়ের, সেটি আগুনে পুড়ে যাওয়া ইউক্রেনের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর বড় সংকটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ভেজা একটি বই তুলে নেওয়া লিলিয়া ভেলিকার চেষ্টা যেন সেই সংকটের বিপরীতে আরেকটি বার্তা দেয়—যুদ্ধ যতই ধ্বংস করুক, বই, জ্ঞান ও স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা থামছে না।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স