ঢাকা

ইরানের সঙ্গে লেনদেন নিয়ে আরও এক ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবে ওয়াশিংটন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
আল–জাজিরা

ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন বন্ধ করতে আরও একটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি সপ্তাহেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, ইরানের সঙ্গে যেসব দেশ ও প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে, তাদের ওপর চাপ বাড়াতে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র কঠোরতম আর্থিক পদক্ষেপ নেবে। তাঁর ভাষায়, ইরানের সঙ্গে এসব লেনদেন ‘অবশ্যই বন্ধ করতে হবে’।

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের অ্যাশভিলে জি-২০ বৈঠকের আগে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে মার্কিন অর্থমন্ত্রী ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেন। বিশেষ করে ইরানের কাছ থেকে চীনের জ্বালানি কেনাকাটা অব্যাহত থাকায় বেইজিংয়ের বিরুদ্ধেও নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি তিনি।

এরই মধ্যে ইরানের সঙ্গে লেনদেনকারী বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। গত সপ্তাহে মিসরের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক বানকু মিসরের সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কার্যক্রমকে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। ইরান সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনের অভিযোগে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

নতুন করে আরও একটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর মার্কিন নীতি এখন আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

‘প্রয়োজনে কঠোরতম আর্থিক পদক্ষেপ’

ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কতটা কঠোর হতে পারে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন বেসেন্ট।

এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর আর্থিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য হলো—ইরানের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক যোগাযোগের পথ যতটা সম্ভব সংকুচিত করা।

বেসেন্টের ভাষায়, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেন বন্ধ করতেই হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় এর আগে ইরানের অর্থনীতির বিভিন্ন খাত, বিশেষ করে তেল ও জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এবার সেই চাপ আরও বিস্তৃত করে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নজর দেওয়া হচ্ছে।

ওয়াশিংটনের হিসাব হলো, ইরানের তেল বিক্রি ও বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে যে অর্থ আসে, তার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা গেলে দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইরানের প্রবেশাধিকার সীমিত করাও এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মিসরের ব্যাংকের পর নতুন পদক্ষেপ

ইরানের সঙ্গে লেনদেনের অভিযোগে গত সপ্তাহে মিসরের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক বানকু মিসরের সংযুক্ত আরব আমিরাতের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের ফলে ব্যাংকটির ওই কার্যক্রম মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইরান সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকার অভিযোগই ছিল এ ব্যবস্থার মূল কারণ।

এর পরপরই আরও একটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ঘোষণা এসেছে।

এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে—ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করলে শুধু ইরানি প্রতিষ্ঠানই নয়, তৃতীয় দেশের ব্যাংক ও কোম্পানিগুলোকেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে হবে।

এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা ব্যাংক ও কোম্পানিগুলোকে একদিকে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার ধরে রাখার মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

চীনের ওপরও চাপ বাড়ানোর ইঙ্গিত

ইরানের অর্থনীতিকে চাপে রাখার মার্কিন কৌশলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো চীন।

ইরানের অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা হিসেবে চীন তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ইরানের তেল বিক্রির আয় দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে চীনা ক্রেতাদের মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানি অব্যাহত থাকলে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপের কার্যকারিতা অনেকটাই সীমিত হতে পারে।

জি-২০ বৈঠকের আগে এপি–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, তিনি চীনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। ইরানের কাছ থেকে চীনের কেনাকাটা অব্যাহত থাকায় বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও আলোচনায় থাকবে।

তিনি বলেন, চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে ‘সব বিকল্প খোলা আছে’।

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র এখন শুধু ইরানের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা তৃতীয় দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চাপের আওতায় আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক কৌশলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’—অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করার অভিযান।

এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক যোগাযোগের পথ যতটা সম্ভব বন্ধ করে দেওয়া এবং দেশটির বৈদেশিক আয় কমিয়ে আনা।

ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, ইরানের তেল বিক্রিসহ আয়ের বিভিন্ন উৎসকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হবে।

শুধু ইরানি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনাই এই নীতির উদ্দেশ্য নয়। অন্য কোনো দেশ, ব্যাংক বা কোম্পানি যাতে তেহরানের সঙ্গে এমন ব্যবসা করতে না পারে, যা ইরানকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বা আন্তর্জাতিক আর্থিক সুবিধা পেতে সহায়তা করে—সেটিও নিশ্চিত করতে চায় ওয়াশিংটন।

বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে এমন প্রতিটি অর্থনৈতিক ‘লাইফলাইন’ বিচ্ছিন্ন করাই এই অভিযানের উদ্দেশ্য।

অর্থাৎ, তেহরানের ওপর চাপ তৈরির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিষেধাজ্ঞার তালিকা দীর্ঘ করতে চাইছে না; বরং ইরানের অর্থনীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংযোগগুলোও একে একে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে।

তেল খাতকে মূল লক্ষ্য

ইরানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বৈদেশিক আয় আসে তেল রপ্তানি থেকে। ফলে তেল বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা কৌশলের কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছে।

ইরান যদি আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে, তাহলে অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার প্রভাব অনেকাংশে সামাল দেওয়া সম্ভব। তাই তেল বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ক্রেতা, পরিবহনকারী, বীমা কোম্পানি, ব্যাংক এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমগুলোকে লক্ষ্য করে চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন।

মার্কিন অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ভবিষ্যতে এই চাপ আরও বিস্তৃত হতে পারে।

বিশেষ করে এমন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করে দেয়, তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে তেহরানের বৈদেশিক বাণিজ্যকে আরও কঠিন করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ইরানের পাল্টা অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।

ইরানের বক্তব্য, বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সীমিত করার মতো অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র নেই। ওয়াশিংটনের একতরফা নিষেধাজ্ঞাকে ইরান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

তেহরানের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থায় অন্য দেশগুলোর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।

ইরান অতীতেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় বিকল্প বাণিজ্যিক ও আর্থিক পথ তৈরির চেষ্টা করেছে। চীনসহ কিছু দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা সেই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ফলে যুক্তরাষ্ট্র যতই নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়াবে, ইরানও তত বেশি বিকল্প বাজার, বিকল্প অর্থ লেনদেনব্যবস্থা ও নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার খোঁজার চেষ্টা করতে পারে।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কতটা হবে

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে তৃতীয় দেশগুলো কতটা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলে তার ওপর।

বিশ্বের বড় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে অনেক প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে ব্যবসা সীমিত করতে পারে।

অন্যদিকে, চীনসহ কিছু দেশ যদি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যায় এবং বিকল্প আর্থিক ও পরিবহনব্যবস্থা ব্যবহার করে, তাহলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

এই কারণেই বেইজিংকে ঘিরে বেসেন্টের মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন ইরানের তেল কেনা অব্যাহত রাখলে তেহরানের অর্থনীতিতে বৈদেশিক আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ খোলা থাকবে।

সামনে আরও কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত

ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিকভাবে একঘরে’ করার অভিযান ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত দীর্ঘমেয়াদি চাপের নীতি নিয়েছে। নতুন ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা সেই নীতিরই আরেকটি ধাপ।

ওয়াশিংটনের লক্ষ্য শুধু ইরানকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখা নয়; বরং দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করতে আগ্রহী তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সম্ভাব্য মার্কিন পদক্ষেপের মুখে দাঁড় করানো।

এতে ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে তেল রপ্তানি থেকে আয় কমানোর মাধ্যমে তেহরানের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

তবে এই নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের পাশাপাশি চীন ও অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কেও নতুন টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার বিস্তৃতি কতদূর যায় এবং ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলো সেই চাপের কতটা মোকাবিলা করতে পারে। নতুন ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংঘাতেরই পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স