সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তাঁর দায়িত্ব পালনের সময় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান শুরুর বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি প্রক্রিয়ার কোনোটিতেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না দাবি করে আসিফ মাহমুদ বলেছেন, তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগে জড়ানো হয়েছে।
একই সঙ্গে দুদকের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা বলা এবং পরে সেই বক্তব্য থেকে সরে আসার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, দুদকের কর্মকর্তার বক্তব্যের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে মানহানি হয়েছে।
এ জন্য দুদককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চেয়ে সংশ্লিষ্ট সংবাদগুলো প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন আসিফ মাহমুদ। তা না হলে আইনি পদক্ষেপ এবং মানহানির মামলা করার হুমকি দিয়েছেন তিনি।
বুধবার রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। দুদকের অনুসন্ধানে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে নিজের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা তুলে ধরতেই তিনি এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।
এর আগে বুধবার বিকেলে দুদক জানিয়েছিল, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে। দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম তখন অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা বলেছিলেন। পরে তিনি ওই বক্তব্য থেকে সরে আসেন বলে সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ দাবি করেন।
২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার দুর্নীতির অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, দুটি ঘটনায় মোট ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে পদায়নের আদেশ করানোর ক্ষেত্রে ৭৬ লাখ টাকা এবং ১৫০ জনকে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ২ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি জানান।
আসিফ মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অভিযোগে তাঁকে তৎকালীন ও বর্তমান যুব ও ক্রীড়া সচিব, একজন যুগ্ম সচিব এবং একজন উপসচিবের সঙ্গে দায়ী করা হয়েছে।
তবে অভিযোগের সঙ্গে প্রকৃত প্রশাসনিক ঘটনার কোনো মিল নেই বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, দুটি ঘটনাই তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও পূর্ববর্তী কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত; কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাঁর সরাসরি ভূমিকা ছিল না।
৩৮ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিলের ব্যাখ্যা
৭৬ লাখ টাকার দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে আসিফ মাহমুদ বলেন, ২০২১ সালে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১১২ জন দশম গ্রেডের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি না দিয়ে নবম গ্রেডের উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তাঁর দাবি, প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে চলতি দায়িত্বে ছয় মাসের বেশি রাখা যায় না। কিন্তু ২০২১ সালে দেওয়া ওই আদেশের মাধ্যমে কর্মকর্তারা ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওই পদে বহাল ছিলেন।
পরে ওই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা হয় এবং ২০২৫ সালে আদালত সেটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন বলে জানান আসিফ মাহমুদ।
তিনি বলেন, আদালতের রায়ের সময় ১১২ জনের মধ্যে ৩৮ জন তখনও ওই চলতি দায়িত্বে ছিলেন। অন্যরা এর মধ্যে অবসরে চলে গিয়েছিলেন অথবা নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছিলেন। আদালতের রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ওই ৩৮ জনের চলতি দায়িত্ব বাতিল করে তাঁদের মূল পদে, অর্থাৎ দশম গ্রেডের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
আসিফ মাহমুদের দাবি, দুদকের অভিযোগে এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ৩৮ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করার অর্থ তাঁদের অন্যায়ভাবে অপসারণ করা নয়; বরং আদালতের রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই তাঁদের মূল পদে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
১৮২ পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া
অন্যদিকে ২ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, ৩৮ জনের চলতি দায়িত্ব বাতিলের ফলে একটি শূন্যপদসহ বিভিন্ন সময়ে শূন্য হওয়া সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার মোট ১৮২টি পদে পদোন্নতির প্রয়োজন দেখা দেয়।
তাঁর দাবি, দুদকের অভিযোগে ১৫০টি পদে পদোন্নতির কথা বলা হলেও বাস্তবে ১৮২টি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।
আসিফ মাহমুদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পদোন্নতির আগে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামত চাওয়া হয়। এরপর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রস্তুত করে তা পিএসসিতে পাঠানো হয়।
এ সময় কর্মকর্তাদের চাকরির রেকর্ড, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), কোনো বিভাগীয় মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা রয়েছে কি না এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যও পিএসসির কাছে পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, এসব তথ্য যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করে পিএসসি পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করে। পরে পিএসসির সুপারিশ অনুযায়ী প্রথম ১৮২ জনকেই পদোন্নতি দেওয়া হয়।
আসিফ মাহমুদ বলেন, পদোন্নতির তালিকা তৈরিতে যদি জ্যেষ্ঠতার নিয়ম উপেক্ষা করে অন্য কাউকে তালিকায় যুক্ত করা হতো, তাহলে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তি থাকতে পারত। কিন্তু পিএসসির সুপারিশ অনুযায়ীই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি পদোন্নতির ক্ষেত্রে পিএসসির সুপারিশ অনুসরণ করাই হয়ে থাকে, তাহলে দুদকের অনুসন্ধানে পিএসসির ভূমিকা যাচাই করা হবে কি না, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
‘দুটি প্রক্রিয়ায় আমার সরাসরি সম্পৃক্ততার সুযোগ ছিল না’
আসিফ মাহমুদ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়টি নাকচ করেছেন।
তিনি বলেন, জেলা পর্যায়ের যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদের পদায়ন বা পদোন্নতির বিষয়গুলো দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা উপদেষ্টার পর্যায়ে নিষ্পত্তি হতে পারে। কিন্তু উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট বিষয় সচিব পর্যায়েই নিষ্পত্তি হয় এবং তা উপদেষ্টার কাছে আসে না।
তাঁর ভাষায়, ‘দুটি আদেশেরই সাইনিং অথরিটি আমি ছিলাম না, ছিলেন সচিব। অর্থাৎ, অফিসিয়ালি এই দুই প্রক্রিয়ায় আমার সরাসরি সংশ্লিষ্টতার সুযোগ ছিল না।’
আসিফ মাহমুদের দাবি, দুদকের অভিযোগে যে ঘটনাক্রম তুলে ধরা হয়েছে, তা প্রকৃত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আদালতের রায় বাস্তবায়ন, চলতি দায়িত্ব বাতিল, শূন্যপদ সৃষ্টি এবং পরবর্তী সময়ে পিএসসির সুপারিশের ভিত্তিতে পদোন্নতি—প্রতিটি ধাপই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
‘তদন্তে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত’
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তে সহযোগিতা করার কথাও জানিয়েছেন আসিফ মাহমুদ।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পদায়ন ও পদোন্নতিসংক্রান্ত ফাইল এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে যাচাই করা হোক।
আসিফ মাহমুদের বক্তব্য, সত্যতা উদ্ঘাটনের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব তথ্য-উপাত্ত ও নথি যাচাইয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, অভিযোগের প্রকৃত প্রেক্ষাপট যাচাই করা হলে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তব ধারাবাহিকতার পার্থক্য স্পষ্ট হবে।
‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চাইতে হবে’
দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলামের বক্তব্য নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আসিফ মাহমুদ।
তিনি দাবি করেন, ওই কর্মকর্তা প্রথমে সংবাদমাধ্যমের সামনে অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা বলেছিলেন। পরে দুদক বিটের সাংবাদিকদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তিনি জানান, বক্তব্য দেওয়ার সময় ‘সত্যতা পাওয়ার’ বিষয়টি তাঁর মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে এবং সেটি প্রচার না করার অনুরোধ করেন।
আসিফ মাহমুদের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে বক্তব্য সংশোধনের অনুরোধ করা হলেও এরই মধ্যে তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে মানহানি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ কারণে দুদকের কাছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং দুদকের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট সংবাদগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন এনসিপির এই মুখপাত্র।
তিনি বলেন, ‘আমি দুদকের প্রতি আহ্বান জানাব, আমার যে মানহানি করা হয়েছে, সেটার জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অ্যাপোলজি (ক্ষমা প্রার্থনা) করবেন এবং আপনাদের বরাত দিয়ে যে খবরগুলো প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার করবেন। অন্যথায় আমি আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব, মানহানির মামলা করতে বাধ্য হব।’
অভিযোগের তদন্ত এখনো চলমান
আসিফ মাহমুদের বক্তব্য অনুযায়ী, দুদকের অভিযোগে যে দুটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো আদালতের রায় বাস্তবায়ন এবং পিএসসির সুপারিশের ভিত্তিতে পদোন্নতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি কোনো ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা বা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে, দুদক এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরুর কথা জানিয়েছে। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। অনুসন্ধানের ফলাফল বা এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
তবে অনুসন্ধান শুরুর প্রক্রিয়া এবং দুদকের কর্মকর্তার বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসিফ মাহমুদ ইতিমধ্যে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। একই সঙ্গে প্রশাসনিক নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বের করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, প্রয়োজন হলে তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সব ধরনের সহযোগিতা করবেন।
দুদকের পক্ষ থেকে তাঁর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চাওয়া, সংবাদ প্রত্যাহার এবং মানহানির মামলা করার হুমকির বিষয়ে পরবর্তী কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে কি না, তা এই বক্তব্যে উল্লেখ নেই।