সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনে বিরোধী দলকে বঞ্চিত করে সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তিনি বলেছেন, সংসদে সদস্যসংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের কমিটির সভাপতি পদে প্রায় ২৬ শতাংশ পাওয়ার কথা। এ বিষয়ে সরকারি দলের সঙ্গে আলোচনায় একটি সমঝোতাও হয়েছিল। কিন্তু পরে সরকারি দল তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
বুধবার জাতীয় সংসদে সংসদীয় কমিটি গঠন নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন তাহের। তিনি বলেন, সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে সদস্যসংখ্যার অনুপাত বিবেচনায় নেওয়াই স্বাভাবিক। তবে কোন দল কতটি সভাপতি পদ পাবে, সে বিষয়ে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি বা প্রিভিলেজবিষয়ক বইয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। ফলে বিষয়টি পারস্পরিক আলোচনা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত।
১০টি সভাপতি পদ দেওয়ার কথা হয়েছিল
তাহের বলেন, একপর্যায়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে ১০টি সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। সে অনুযায়ী বিরোধী দলের কাছ থেকে সম্ভাব্য সভাপতিদের তালিকাও চাওয়া হয় এবং তারা সেই তালিকা জমা দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘একটা সময় সরকারি দলের পক্ষ থেকে আমাদেরকে ১০টি সভাপতির পদ দেওয়া হবে বলে বলাও হয়েছিল। এবং আমাদের কাছ থেকে তালিকাও নেওয়া হয়েছিল। আমরা অ্যাকোর্ডিংলি তালিকাও জমা দিয়েছি।’
কিন্তু পরে সরকারি দলের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে বিষয়টি ভিন্ন দিকে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাহেরের মতে, এমন আচরণ সংসদের নিয়মিত সদস্যদের কমিটির কাজে আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। তিনি বিষয়টিকে দুর্ভাগ্যজনক বলেও মন্তব্য করেন।
‘টু-থার্ড মেজরিটির কারণে বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে’
সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়টি তুলে ধরে তাহের অভিযোগ করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকারি দল একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে সরকারি দল টু-থার্ড মেজরিটির কারণে কিছুটা বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে। তারা নিজেরাই যেভাবে ডিসাইড করছে, সেটাই এখানে তারা প্রয়োগ করছে।’
তাহেরের বক্তব্য, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বজায় রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে হলে সেখানে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
সংসদ পরিচালনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় উপনেতা। তিনি বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির জবাব দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই দাঁড়িয়ে জবাব দিচ্ছেন।
তাহের বলেন, ‘আমরা দেখছি এই সংসদ এটা ব্যাড অর গুড কালচার আমি জানি না। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যখনই কোনো কথা বলা হয় এটা রিলেটেড মন্ত্রীরা বা লোকেরা জবাব না দিলেও মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো দাঁড়ায়ে যান। উনি একটা জবাব দেন।’
এ বিষয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, সংসদে বক্তব্য ও জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও ভূমিকার একটি ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন।
তিনি স্পিকারকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি আপনার প্রতি অনুরোধ করব এই বিষয়টি আপনার দিক থেকেও একটু খেয়াল থাকা উচিত মাননীয় স্পিকার।’
‘আমরা বাচ্চা ছেলে না’
সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে সরকারি দলের অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে তাহের বলেন, বিরোধী দলকে কমিটিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পরে সভাপতি পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থান নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, ‘এটা খুবই ইনডিসেন্ট (অশোভন) যে সরকারি দল যখন বলে যে আপনারা এই কমিটিতে আসেন তাইলে আপনাদের এটা দিব। আমরা তো বাচ্চা ছেলে না যে আমাদের ললিপপ দেখায়া দেখায়া আপনি নিয়ে যাবেন, আর একটা জায়গায় গিয়া আপনি আমাদের অন্যভাবে ডিল করবেন।’
সরকারি দল সব সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ নিজেদের হাতে রাখতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাহের বলেন, ‘ওনারা তো এটা ডিসাইড করতে পারেন না যে শতভাগ সভাপতি ওনারা নেবেন, এটা কোথায় লেখা আছে? এটা কি সংবিধানে আছে?’
‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার সিদ্ধান্তই যদি সব হয়, সেটি স্বৈরাচার’
শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদের সব সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হলে তা গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না বলে মন্তব্য করেন তাহের।
তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছাই যদি সংসদের সিদ্ধান্তে পরিণত হয়, তাহলে সেটি স্বৈরাচারী আচরণের পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
তাঁর ভাষায়, ‘স্বৈরাচার মিনস আমি যা যা চাই এটাই আইন, এটাই আমার আচরণ হবে। আমরা এই পার্লামেন্টকে এভাবে দেখতে চাই না।’
তাহের বলেন, সংসদে সরকারি ও বিরোধী—উভয় পক্ষের মতামতের মূল্য থাকা উচিত। সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্মান, আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সংসদ পরিচালিত হলে তবেই সংসদ কার্যকর ও গণতান্ত্রিক ভূমিকা রাখতে পারবে।
‘আরেকটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চাচ্ছি না’
সংসদীয় কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারি দলকে দেশের স্বার্থ ও গণতন্ত্রের কথা বিবেচনা করে বৈষম্যমূলক আচরণ না করার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় উপনেতা।
তিনি বলেন, সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হলে তা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি অতীতের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কথাও তুলে ধরেন।
তাহের বলেন, ‘কারণ আমরা আরেকটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চাচ্ছি না।’
তিনি আরও বলেন, সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলকে কোনো সুযোগ না দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে তা অন্যায় প্রতিষ্ঠার শামিল হবে।
সবশেষে তিনি ইঙ্গিত দেন, সংসদীয় কমিটি গঠনেও যদি একই ধরনের একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে বিরোধী দলের অবস্থান আরও কঠোর হতে পারে। তাঁর বক্তব্যে সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধী দলের যথাযথ অংশগ্রহণ এবং কমিটির নেতৃত্বে সদস্যসংখ্যার অনুপাত বিবেচনার দাবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।