কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের একটি জলাধারে হঠাৎ ভেসে ওঠা একটি রহস্যময় দ্বীপ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। সবুজ গাছপালায় ঢাকা দ্বীপটি কোথা থেকে এল, কীভাবে পানির ওপর ভেসে রইল—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই আবার অদৃশ্য হয়ে গেছে সেটি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরুর দিকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ম্যাকেঞ্জি শহরের উত্তরে উইলিস্টন জলাধারে গাছপালায় ঢাকা ওই দ্বীপটি দেখা যায়। পরে দ্বীপটির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি আরও ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার বর্গফুট বা তার কিছু বেশি আয়তনের দ্বীপটির আকার একটি ফুটবল মাঠের প্রায় সমান বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে দ্বীপটির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক শুধু এর হঠাৎ আবির্ভাব নয়—কিছুদিন পর একইভাবে সেটি আবার উধাও হয়ে যায়।
স্যাটেলাইট ছবিতে মিলল দ্বীপের অস্তিত্ব
দ্বীপটি নিয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পাওয়ার পর এর সত্যতা যাচাইয়ে উদ্যোগী হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বর্তমানে সহজেই বাস্তবসম্মত ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। ফলে শুরুতে ঘটনাটি নিয়ে সংশয় ছিল।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া হাইড্রোর মুখপাত্র বব গ্যামার জানান, তাঁরাও প্রথমে খবরটি নিয়ে সন্দিহান ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘শুরুতে এ খবর নিয়ে সন্দিহান ছিলাম। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সহজেই ভুয়া ছবি–ভিডিও তৈরি করা যায়।’
তবে পরে স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে দ্বীপটির অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। কর্মকর্তারা জানান, ২০ জুলাইয়ের স্যাটেলাইট ছবিতে জলাধারের পানির ওপর ওই দ্বীপকে দেখা গেছে।
অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি বা স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে দেখা কোনো কল্পিত দৃশ্য ছিল না—স্যাটেলাইট ছবিতেও জলাধারে ভাসমান ওই ভূখণ্ডের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল।
হঠাৎ দেখা, আবার হঠাৎই অদৃশ্য
দ্বীপটির অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী প্রশ্ন ওঠে—এটি কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় রয়েছে?
কিন্তু কর্মকর্তাদের অনুসন্ধানকে আরও জটিল করে দেয় দ্বীপটির হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। ৫ আগস্টের পরের স্যাটেলাইট ছবিগুলোতে আর দ্বীপটিকে দেখা যায়নি।
বব গ্যামার বলেন, দ্বীপটির অবস্থান শনাক্ত করার পর তাঁরা আরও হালনাগাদ স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহ করছেন। কিন্তু সর্বশেষ ছবিগুলোতে সেটির আর কোনো চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে না।
তাঁর ভাষায়, ‘আমরা স্যাটেলাইটের আরও হালনাগাদ ছবি নিচ্ছি, কিন্তু এখন আর ওই দ্বীপ দেখতে পাচ্ছি না। এটি এখন অদৃশ্য হয়ে গেছে।’
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া হাইড্রোর এই কর্মকর্তা অবশ্য মনে করেন না যে দ্বীপটি জলাধারের পানিতে ডুবে গেছে।
‘সম্ভবত তীরের কাছে ফিরে গেছে’
দ্বীপটি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য ব্যাখ্যাও দিয়েছেন গ্যামার। তাঁর ধারণা, এটি পানির নিচে ডুবে যাওয়ার পরিবর্তে জলাধারের তীরের কাছাকাছি কোনো অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এর মানে (দ্বীপটি অদৃশ্য হওয়া) এই নয় যে এটি জলাধারে ডুবে গেছে। সম্ভবত এটি তীরের কাছাকাছি কোনো অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে ফিরে গেছে।’
তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দ্বীপটি আসলে প্রচলিত অর্থে মাটি বা পাথরের তৈরি কোনো স্থির দ্বীপ নাও হতে পারে। বরং দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ভাসমান কাঠ, গাছপালা ও শিকড়ের সমন্বয়ে তৈরি একটি বিশাল ভাসমান ভূখণ্ড হতে পারে এটি।
কীভাবে তৈরি হতে পারে ভাসমান দ্বীপ?
বব গ্যামারের ধারণা, এই ভাসমান দ্বীপটি সম্ভবত কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে।
জলাধারের তীরবর্তী এলাকায় সময়ের সঙ্গে ভাসমান কাঠ ও গাছের বিভিন্ন অংশ জমা হতে পারে। পরে এসব কাঠ পচতে শুরু করলে তার ওপর উদ্ভিদ জন্মানোর উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সেখানে গাছপালা ও গাছের শিকড় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এভাবে কাঠ, উদ্ভিদ, শিকড় ও জৈব পদার্থের স্তর জমে একটি ঘন ও তুলনামূলকভাবে শক্ত ভাসমান কাঠামো তৈরি হতে পারে।
এরপর জলাধারের পানির উচ্চতা বাড়লে তীরের সঙ্গে যুক্ত থাকা ওই কাঠামো কোনো একপর্যায়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পানিতে ভেসে যেতে পারে। দূর থেকে তখন সেটিকে দেখতে অনেকটা ছোট একটি সবুজ দ্বীপের মতো মনে হতে পারে।
গ্যামারের মতে, উইলিস্টন জলাধারে দেখা দেওয়া দ্বীপটির ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটে থাকতে পারে।
পানির উচ্চতার সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে
ভাসমান দ্বীপটির অবস্থান ও গতিপথের সঙ্গে জলাধারের পানির উচ্চতার সম্পর্ক থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। তীরের সঙ্গে যুক্ত থাকা কোনো ভাসমান কাঠামো পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এরপর বাতাস, পানির স্রোত কিংবা ঢেউয়ের প্রভাবে সেটি জলাধারের অন্য অংশে সরে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে স্যাটেলাইটের একটি ছবিতে দ্বীপটি দেখা গেলেও পরবর্তী ছবিতে সেটি আর একই জায়গায় নাও থাকতে পারে। তীরের কাছাকাছি বা অন্য কোনো স্থানে সরে গেলে ওপর থেকে সেটি শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে যায়।
তাই দ্বীপটি ‘উধাও’ হয়ে যাওয়ার অর্থ যে সেটি ধ্বংস হয়ে গেছে বা পানিতে ডুবে গেছে, এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
আগে এমন ঘটনা দেখেনি কর্তৃপক্ষ
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া হাইড্রোর মুখপাত্র বব গ্যামার জানিয়েছেন, এমন ঘটনার কথা তাঁরা আগে শোনেননি। একই সঙ্গে খুব বেশি মানুষ দ্বীপটি দেখেছেন বলে রিপোর্টও পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, ‘নিশ্চিতভাবে এটি এমন একটি ঘটনা, যা আমরা আগে শুনিনি। আর খুব বেশি মানুষ দ্বীপটি দেখতে পাওয়ার কথাও জানাননি। তাই এটি কোথায় দেখা গেছে, তা খুঁজে বের করা কঠিন ছিল।’
স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওর ভিত্তিতে ঘটনাটি নজরে আসে। পরে স্যাটেলাইট ছবিতে দ্বীপটির অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়।
তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি আবার দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ায় রহস্য আরও বেড়েছে।
রহস্যের পুরোপুরি সমাধান হয়নি
এখন পর্যন্ত দ্বীপটির সুনির্দিষ্ট উৎস, গঠন এবং বর্তমানে এর অবস্থান নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। কর্তৃপক্ষের ধারণা, এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কাঠ ও উদ্ভিদের সমন্বয়ে তৈরি একটি ভাসমান ভূখণ্ড হতে পারে এবং পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে তীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জলাধারে ভেসে এসেছে।
পরে বাতাস, স্রোত বা পানির গতিবিধির কারণে এটি অন্যত্র সরে গিয়ে স্যাটেলাইটের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেতে পারে।
অর্থাৎ, উইলিস্টন জলাধারের এই ‘ভাসমান দ্বীপ’ হয়তো কোনো রহস্যময় অতিপ্রাকৃত ঘটনার ফল নয়; বরং প্রকৃতির দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়ায় তৈরি একটি বিরল ভাসমান কাঠামো। তবে সেটি ঠিক কোথা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং বর্তমানে কোথায় রয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া না পর্যন্ত ঘটনাটির পুরো রহস্যের সমাধান হচ্ছে না।