যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসাধারী কর্মীদের স্বামী বা স্ত্রীর বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত বা বাতিল করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে হাজারো এইচ-৪ ভিসাধারী তাঁদের চাকরি হারাতে পারেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এইচ-১বি কর্মীদের পরিবারগুলোর ওপর এর বড় ধরনের আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (ডিএইচএস) দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রক কার্যসূচিতে এই প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। প্রস্তাবটি কবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে, সে বিষয়েও এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানানো হয়নি।
নিয়ম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নির্দিষ্ট কিছু এইচ-৪ ভিসাধারী স্বামী বা স্ত্রী আর কর্মসংস্থানের অনুমতি পাওয়ার যোগ্য থাকবেন না। এর ফলে ২০১৫ সালে চালু হওয়া এইচ-৪ এমপ্লয়মেন্ট অথরাইজেশন ডকুমেন্ট বা ইএডি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতিল হয়ে যেতে পারে।
কী রয়েছে ডিএইচএসের প্রস্তাবে
ডিএইচএসের প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শ্রেণির এইচ-৪ নির্ভরশীল স্বামী বা স্ত্রীকে কর্মসংস্থানের অনুমতি পাওয়ার যোগ্যতা থেকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এর মাধ্যমে ২০১৫ সালে জারি করা একটি চূড়ান্ত বিধি বাতিল করে এইচ-৪ ভিসাধারীদের কাজের অনুমতি না দেওয়ার আগের নীতি ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হতে পারে।
এইচ-৪ ভিসা নিজে কোনো কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসা নয়। এইচ-১বি, এইচ-১বি১, এইচ-২এ, এইচ-২বি অথবা এইচ-৩ ভিসাধারীদের নির্ভরশীল নিকট স্বজনদের যুক্তরাষ্ট্রে তাঁদের সঙ্গে বসবাসের সুযোগ দিতে এই ভিসা দেওয়া হয়।
তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে এইচ-৪ ভিসাধারী স্বামী বা স্ত্রী আলাদাভাবে ইএডির জন্য আবেদন করতে পারেন। অনুমোদন পাওয়ার পর তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ পান।
এখনই কাজের অনুমতি বাতিল হচ্ছে না
প্রস্তাবটি সামনে এলেও এই মুহূর্তে এইচ-৪ ভিসাধারীদের কাজের অনুমতি বাতিল হচ্ছে না। কারণ, ডিএইচএসের নিয়ন্ত্রক কার্যসূচিতে কোনো প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানেই তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়ে যাওয়া নয়।
নিয়ম পরিবর্তনের জন্য প্রথমে ডিএইচএসকে ফেডারেল রেজিস্ট্রারে আনুষ্ঠানিক ‘নোটিশ অব প্রপোজড রুলমেকিং’ প্রকাশ করতে হবে। এরপর প্রস্তাবিত বিধি নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হবে।
জনমত গ্রহণ ও প্রশাসনিক পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত বিধি জারি করা হলে তবেই নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থাৎ, তত দিন পর্যন্ত বৈধ ইএডি থাকা এইচ-৪ ভিসাধারীরা বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।
কারা এইচ-৪ ভিসা পান
এইচ-৪ হলো যুক্তরাষ্ট্রের একটি অ-অভিবাসী ভিসা। মূলত এইচ-১বি এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট ধরনের ভিসাধারীর ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।
এইচ-১বি ভিসাধারী কর্মীদের স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানরা নির্দিষ্ট শর্তে এইচ-৪ ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁদের সঙ্গে বসবাস করতে পারেন।
তবে এই ভিসা পাওয়ার অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজের অনুমতি পাওয়া নয়। কাজ করতে হলে যোগ্য এইচ-৪ স্বামী বা স্ত্রীকে আলাদাভাবে ইএডি নিতে হয়।
বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণত এইচ-৪ ভিসাধারী স্বামী বা স্ত্রীর কর্মসংস্থানের অনুমতির যোগ্যতা নির্ভর করে তাঁদের এইচ-১বি ভিসাধারী সঙ্গীর অভিবাসন বা গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট পর্যায়ে থাকার ওপর।
কেন এই ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ
এইচ-৪ ইএডি ব্যবস্থা চালুর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এইচ-১বি কর্মীদের যোগ্য স্বামী বা স্ত্রীরা চাকরি করার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে অনেক পরিবারে দ্বিতীয় একজনের আয় যুক্ত হওয়ায় তাঁদের আর্থিক সক্ষমতা বেড়েছে।
এই কর্মসংস্থানের সুযোগ বাতিল হলে শুধু চাকরি হারানোর ঝুঁকিই তৈরি হবে না, পরিবারের আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি পেশাগত ক্যারিয়ারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে যেসব পরিবারে একজন সদস্যের এইচ-১বি ভিসার চাকরিই প্রধান আয়ের উৎস, সেখানে দ্বিতীয় উপার্জনকারীর কাজের সুযোগ হারানো পরিবারটির আর্থিক পরিকল্পনায় চাপ তৈরি করতে পারে।
ভারতীয় পরিবারগুলো কেন বেশি ঝুঁকিতে
প্রস্তাবটি কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয় পেশাজীবীদের পরিবারগুলোকে।
এর অন্যতম কারণ, এইচ-৪ ইএডি অনুমতিপত্রধারীদের বড় একটি অংশ ভারতীয় নাগরিক। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এইচ-৪ ইএডি আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত আবেদনগুলোর প্রায় ৯৩ শতাংশই পেয়েছিলেন ভারতীয় নাগরিকেরা।
আর এসব ভারতীয় ইএডি অনুমতিপত্রধারীর প্রায় ৯৪ শতাংশ ছিলেন নারী।
ফলে নতুন বিধি কার্যকর হলে ভারতীয় এইচ-১বি কর্মীদের স্ত্রীদের একটি বড় অংশ তাঁদের বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
এ কারণে প্রস্তাবটি শুধু অভিবাসননীতি বা ভিসা ব্যবস্থার পরিবর্তন নয়; যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয় পরিবারগুলোর আয়, কর্মজীবন এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন পরিকল্পনার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ও উঠেছিল বিষয়টি
এইচ-৪ ইএডি বাতিলের উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
২০১৭ সালে নির্দিষ্ট কিছু এইচ-৪ ভিসাধারীর কর্মসংস্থানের অনুমতি বাতিলের প্রস্তাব করেছিল ডিএইচএস। তবে সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত রূপ পায়নি। পরে ২০২১ সালে সেটি প্রত্যাহার করা হয়।
এবার নতুন করে এইচ-৪ কর্মসংস্থানের অনুমতি নিয়ে উদ্যোগ সামনে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতিতে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এইচ-১বি ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ
এইচ-৪ ইএডি নিয়ে নতুন প্রস্তাবটি এমন সময়ে এসেছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি ভিসা ব্যবস্থাতেও একাধিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে।
এইচ-১বি ভিসা মূলত উচ্চদক্ষতার বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগ দেওয়ার অন্যতম প্রধান ব্যবস্থা। প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গবেষণা ও বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মী এই ভিসার ওপর নির্ভরশীল।
এইচ-১বি কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এইচ-৪ ভিসা এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কাজের অনুমতি তাই যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সামনে কী হতে পারে
ডিএইচএসের নিয়ন্ত্রক কার্যসূচিতে প্রস্তাবটি অন্তর্ভুক্ত হলেও এটি এখনো চূড়ান্ত বিধি নয়। ফলে এই মুহূর্তে বৈধ ইএডি থাকা এইচ-৪ ভিসাধারীদের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার মতো কোনো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন হয়নি।
প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ মতামত জানানোর সুযোগ পাবেন। এরপর প্রশাসনিক পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত বিধি জারি হলে তবেই এর বাস্তব প্রভাব স্পষ্ট হবে।
তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে সেই পরিবারগুলোর ওপর, যাদের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও পেশাগত পরিকল্পনার সঙ্গে এইচ-৪ ইএডির কর্মসংস্থান সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে ভারতীয় পেশাজীবীদের পরিবারগুলো এতে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।