ফেনীর দাগনভূঞায় বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা শেষে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে দলটির দুই পক্ষের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী এবং দুই গণমাধ্যমকর্মীসহ অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন বলে দলীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে।
বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়কের দাগনভূঞা আতাতুর্ক সরকারি মডেল হাইস্কুলের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
আহত ব্যক্তিদের মধ্যে দাগনভূঞা পৌর যুবদলের সদস্যসচিব ইকবাল হোসেন, উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি এম সাইফুল ইসলাম, ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ রাব্বি এবং গণমাধ্যমকর্মী শাখাওয়াত টিপু ও ফখরুল ইসলাম রয়েছেন। আহত ইকবাল হোসেনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
আলোচনা সভা শেষে উত্তেজনা
পুলিশ ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেল চারটার দিকে দাগনভূঞা আতাতুর্ক সরকারি মডেল হাইস্কুলের মিজান মিলনায়তনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা শুরু হয়। উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেন। প্রধান অতিথি ছিলেন ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী হাবিবুল্লাহ।
সভায় যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন। সভা শেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে নেতা-কর্মীরা বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে মহাসড়কের দিকে আসার সময় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় নেতা-কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মহাসড়কের অপর পাশে জেলা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত সহসভাপতি কাজী জামশেদুর রহমানের সমর্থকেরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁদের পক্ষের একজন অপর পক্ষের নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে পানির বোতল ও জুতা ছুড়ে মারেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এরপর অপর পক্ষের নেতা-কর্মীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। কিছু সময় ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে পথচারী ও গণমাধ্যমকর্মীদের কেউ কেউ আহত হন বলেও জানা গেছে।
আকবর হোসেনের অভিযোগ
ঘটনার জন্য বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা কাজী জামশেদুর রহমানের সমর্থকদের দায়ী করেছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেন।
তাঁর অভিযোগ, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সভা শেষে নেতা-কর্মীদের নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বের হওয়ার সময় কাজী জামশেদুর রহমানসহ কয়েকজন তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে অতর্কিত হামলা চালান।
আকবর হোসেনের দাবি, হামলায় তিনি নিজে এবং তাঁর স্ত্রী শাহিনা আকবর আহত হয়েছেন। এ ছাড়া উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি নিজাম উদ্দিন ভূঁঞা, বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী মহিলা দলের নেত্রী জাহানার বেগম, রাজাপুর ইউনিয়ন বিএনপি নেতা জামাল হোসেন, বাকি বিল্লাহ, শ্রমিক দল নেতা বাদশা ও রিজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা শুক্কুর এবং পৌর যুবদলের সদস্যসচিব ইকবাল হোসেনসহ আরও অনেকে আহত হয়েছেন।
তবে আকবর হোসেনের এই অভিযোগের বিষয়ে অপর পক্ষ ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে।
পাল্টা অভিযোগ কাজী জামশেদুরের
কাজী জামশেদুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁর সমর্থকেরা মহাসড়কের পাশে শান্তিপূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আকবর হোসেনের লোকজনই তাঁদের ওপর অতর্কিতভাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন।
তাঁর ভাষ্য, ওই ঘটনায় তাঁর পক্ষের নেতা-কর্মীরা উত্তেজিত হয়ে পড়লেও তিনি তাঁদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন।
কাজী জামশেদুর রহমানের দাবি, সংঘর্ষে তাঁদের পক্ষের মোহাম্মদ রাব্বি, রিয়াজ, রায়হান, নাঈমুর ও হুমায়ুনসহ প্রায় ১৫ জন আহত হয়েছেন।
অর্থাৎ, সংঘর্ষের সূত্রপাত কে করেছেন—এ নিয়ে দুই পক্ষ পরস্পরকে দায়ী করছে। ঘটনার স্বাধীন তদন্ত বা প্রত্যক্ষদর্শীদের নিরপেক্ষ বক্তব্য ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কোনো পক্ষকে দায়ী করা যায়নি।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন আহতরা
দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) খন্দকার মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বুধবার সন্ধ্যা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সংঘর্ষে আহত আটজন সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন।
তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা তুলনামূলক গুরুতর হওয়ায় তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ
দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম নোমান বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভা শেষে দুই পক্ষের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ওসি বলেন, সংঘর্ষে দুই পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। তবে রাত নয়টা পর্যন্ত কোনো পক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়নি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ না থাকায় সংঘর্ষের কারণ ও দায় নির্ধারণে পুলিশের আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঘটনাস্থল ও আশপাশে পুলিশের নজরদারি রয়েছে বলে জানা গেছে।