ঢাকা

৪৭৪ বছর শুধু ছেলেদের, এবার প্রথমবার ছাত্রী নিচ্ছে যুক্তরাজ্যের স্কুল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বিবিসি

প্রতিষ্ঠার ৪৭৪ বছর পর প্রথমবারের মতো ছাত্রী ভর্তি করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী বেডফোর্ড স্কুল। ১৫৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু হবে। অর্থাৎ, তখন থেকে ছেলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি মেয়েরাও এখানে পড়াশোনার সুযোগ পাবে।

বেডফোর্ড স্কুল বর্তমানে একটি বেসরকারি ডে ও বোর্ডিং স্কুল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি ছেলেদের জন্য পরিচালিত হয়ে এলেও এবার সেই ঐতিহ্যে বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

স্কুলটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে হারপুর ট্রাস্ট। ১৭৬৪ সাল থেকে ট্রাস্টটি বেডফোর্ড স্কুল পরিচালনা করে আসছে। আগামী ১২ মাসে ট্রাস্টের আওতাধীন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে বড় ধরনের বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তারই অংশ হিসেবে বেডফোর্ড স্কুলে সহশিক্ষা কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

হারপুর ট্রাস্টের ভাষ্য, এই পরিবর্তনের ফলে শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়বে না; বরং আরও বেশি তরুণ-তরুণীর জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বর্তমানে স্কুলটির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অভিজ্ঞতাও আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।

৪৭৪ বছরের ঐতিহ্যে বড় পরিবর্তন

বেডফোর্ড স্কুলের ইতিহাস ১৬ শতকে ফিরে যায়। ১৫৫২ সালে প্রতিষ্ঠার পর কয়েক শতাব্দী ধরে প্রতিষ্ঠানটি ছেলেদের শিক্ষাদান করে আসছে। দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর এবার সেখানে বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে স্কুলটিতে মেয়েদের ভর্তি শুরু হলে এটি একটি সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এর ফলে বেডফোর্ড স্কুলের শিক্ষার্থীসংখ্যা ও শিক্ষার পরিধি উভয়ই বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

হারপুর ট্রাস্ট জানিয়েছে, শিক্ষার পরিবর্তনশীল চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য আরও বিস্তৃত ও আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা।

স্কুলটির ডে ও বোর্ডিং—দুই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থাই রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে মেয়েরাও এই দুই ধরনের শিক্ষার সুযোগ নিতে পারবে।

শুধু বেডফোর্ড স্কুল নয়, অন্য প্রতিষ্ঠানেও বিনিয়োগ

বেডফোর্ড স্কুলে ছাত্রী ভর্তি করানোর সিদ্ধান্তটি হারপুর ট্রাস্টের বৃহত্তর বিনিয়োগ পরিকল্পনার একটি অংশ। আগামী এক বছরে ট্রাস্টের আওতাধীন অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অবকাঠামো ও শিক্ষার্থীবান্ধব সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করা হবে।

এই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বেডফোর্ড গার্লস স্কুলের সুযোগ-সুবিধা উন্নয়ন, বেডফোর্ড মডার্ন স্কুলের ক্যাম্পাস সংস্কার এবং পিলগ্রিমস প্রি-প্রিপারেটরি স্কুলে শিশুদের যত্ন ও পরিচর্যার জন্য অতিরিক্ত অর্থায়ন।

অর্থাৎ, একটি স্কুলকে সহশিক্ষা কার্যক্রমে নিয়ে আসার পাশাপাশি ট্রাস্টের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বেডফোর্ড গার্লস স্কুলে নতুন মিউজিক সেন্টার

বেডফোর্ড গার্লস স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন একটি মিউজিক সেন্টার ও রিসাইটাল স্পেস তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে সংগীতচর্চা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য আরও উন্নত পরিবেশ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া স্কুলটির ক্রীড়া কার্যক্রমেও বিনিয়োগ করা হবে। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একটি নতুন ওয়েলবিইং হাব স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশে শুধু একাডেমিক শিক্ষাই নয়, সংগীত, খেলাধুলা ও মানসিক সুস্থতার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনায় তাই এসব ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংস্কার হচ্ছে বেডফোর্ড মডার্ন স্কুলেও

হারপুর ট্রাস্টের বিনিয়োগ পরিকল্পনার আওতায় বেডফোর্ড মডার্ন স্কুলের ক্যাম্পাসেও সংস্কারকাজ করা হবে।

চলমান সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে স্কুলটির অভ্যর্থনা এলাকা নতুন করে সাজানো হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রয়োজন বিবেচনায় একটি বহুধর্মীয় প্রার্থনাকক্ষ তৈরি করা হবে।

এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশকে আরও আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শিক্ষার্থীবান্ধব করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, পিলগ্রিমস প্রি-প্রিপারেটরি স্কুলে শিশুদের যত্ন ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে অর্থায়ন বাড়ানো হবে। ছোট শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

‘শিক্ষার জগৎ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে’

হারপুর ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী ডেভিড স্টিডম্যান বলেন, শিক্ষার জগৎ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন মেটাতে তাদের স্কুলগুলো কীভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করতে পারে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়।

তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। বেডফোর্ড স্কুলে সহশিক্ষা চালুর সিদ্ধান্তও সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ।

ডেভিড স্টিডম্যান আরও বলেন, তারা আত্মবিশ্বাসী যে এসব পরিকল্পনা তাদের স্কুলগুলোকে আগামী প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানসম্মত শিক্ষার অভিজ্ঞতা দিতে সক্ষম করবে।

ঐতিহ্য ও পরিবর্তনের সমন্বয়

বেডফোর্ড স্কুলে ছাত্রী ভর্তি করার সিদ্ধান্তটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভর্তি নীতির পরিবর্তন নয়; বরং প্রায় পাঁচ শতাব্দীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ঐতিহ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন।

১৫৫২ সালে প্রতিষ্ঠার পর ৪৭৪ বছর ধরে ছেলেদের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকার পর ২০২৭ সালে স্কুলটির দরজা মেয়েদের জন্যও খুলে যাবে। এর মধ্য দিয়ে বেডফোর্ড স্কুল আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে নতুন যাত্রা শুরু করবে।

হারপুর ট্রাস্টের বিনিয়োগ পরিকল্পনা থেকে একই সঙ্গে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট—বর্তমান সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার ওপর নির্ভর করছে না। আধুনিক অবকাঠামো, সংগীত ও ক্রীড়া কার্যক্রম, শিশুদের যত্ন, মানসিক সুস্থতা এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রয়োজনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়াও শিক্ষার সামগ্রিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠেছে।

সেই বাস্তবতায় ৪৭৪ বছরের পুরোনো বেডফোর্ড স্কুলের সহশিক্ষায় প্রবেশকে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে একটি নতুন সমন্বয়ের সূচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স