ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে মেয়র পদে তিন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী অনেকটাই চূড়ান্ত হয়ে এসেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেনি। তবে দল দুটির সূত্র বলছে, দুই সিটিতে তাদের পছন্দের প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবার নির্দলীয় পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিএনপি ও জামায়াত সরাসরি দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দেবে না। দল দুটি নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। ফলে ব্যালটে দলীয় প্রতীক না থাকলেও ভোটের মাঠে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান এবং সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনটি রাজনৈতিক শক্তির তিন ধরনের প্রার্থীকে ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপি সামনে আনছে সিটি প্রশাসনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের, জামায়াতের প্রার্থীদের একজন নগর সংগঠনের নেতা এবং অন্যজন ছাত্ররাজনীতির পরিচিত মুখ। অন্যদিকে এনসিপি বেছে নিয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সম্মুখসারির দুই পরিচিত মুখকে।
বিএনপির পছন্দ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দুজন
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা উত্তরে মেয়র পদে মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং দক্ষিণে মো. আবদুস সালামের নাম প্রায় চূড়ান্ত করেছে দলটি। গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাঁদের দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সময়ই তাঁদের নাগরিক সেবার পাশাপাশি সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ফলে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থী ঘোষণা না করলেও দুই সিটিতে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে দলের ভেতরে বড় ধরনের টানাপোড়েন নেই।
তবে বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত শফিকুল ইসলাম খান ও আবদুস সালামই সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। প্রার্থী বাছাইয়ের আগে বিভিন্ন মাধ্যমে জরিপও হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালাম গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্জীব হয়ে পড়েছিল। এখন সে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। চেষ্টা করছি, নাগরিকদের সুযোগ–সুবিধাগুলো নিশ্চিত করার।’
নির্বাচন ও নাগরিক সেবা—দুই বিষয়েই প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জনগণ যা চায়, সে অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করছি। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
আবদুস সালাম বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সংগঠক। তিনি দীর্ঘ সময় ঢাকা মহানগর দক্ষিণে দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তরের সম্ভাব্য প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা–১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমানের কাছে পরাজিত হন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি কোনো প্রার্থী মনোনয়ন দেবে না। তবে তৃণমূল পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, স্থানীয়ভাবে যিনি জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য, তাঁকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দিয়ে বিজয়ী করার জন্য।
জামায়াতের উত্তরে নগর নেতা, দক্ষিণে ছাত্ররাজনীতির পরিচিত মুখ
ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াতে ইসলামীর পছন্দের প্রার্থীও অনেকটা চূড়ান্ত বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। দলটি ঢাকা উত্তরে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে মো. আবু সাদিককে—যিনি সাদিক কায়েম নামে পরিচিত—সমর্থন দিতে যাচ্ছে।
মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির। অন্যদিকে সাদিক কায়েম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি। গত জুলাই পর্যন্ত তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে তিনি জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
সেলিম উদ্দিন এর আগে সিলেট–৬ (গোলাপগঞ্জ–বিয়ানীবাজার) আসনে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। তবে ঢাকা উত্তরে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে তিনি বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় সাংগঠনিক ও সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাদিক কায়েমের রাজনৈতিক পরিচিতি মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনিও জামায়াতের বিভিন্ন ঘরোয়া কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন এবং সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তৎপরতা চালাচ্ছেন।
তবে জামায়াতের একজন দায়িত্বশীল নেতার ভাষ্য, সাদিক কায়েম এখনো ডাকসুর প্রতিনিধিত্ব করছেন। এ কারণে জামায়াতের রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ আপাতত প্রকাশ্য করা হচ্ছে না।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য মু. আতাউর রহমান সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে যাচ্ছেন এবং তিনি খুব সাড়া পাচ্ছেন। আমরা আশাবাদী, নগরবাসী তাঁকে বিজয়ী করে তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগোবেন।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল ঢাকায় দলীয় একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দল সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
ঢাকার দুই সিটিতেও প্রার্থী মনোনীত করা হয়েছে, তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি। গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্যের কথা উল্লেখ করে উত্তরে সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে সাদিক কায়েম প্রার্থী বলে জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার।
প্রথমবার নির্বাচনী মাঠে আসিফ মাহমুদ
বিএনপি ও জামায়াত যেখানে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এড়িয়ে সমর্থনের কৌশল নিয়েছে, সেখানে এনসিপি ঢাকার দুই সিটিতেই সরাসরি প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
গত রোববার দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম ঘোষণা করেন।
আসিফ মাহমুদের জন্য এটি হবে সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রথম বড় পরীক্ষা। এর আগে তিনি সংসদ কিংবা স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হননি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর পরিচিতি বাড়ে।
অন্যদিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ঢাকা–৮ আসনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা মির্জা আব্বাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।
সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নিজেদের ভোটার এলাকাও পরিবর্তন করেছেন। আসিফ মাহমুদ ঢাকা উত্তর সিটির ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে এবং পাটওয়ারী দক্ষিণ সিটির ২১ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার হয়েছেন। এর পরই তাঁদের দুই সিটিতে মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করে এনসিপি।
তিন দলের তিন ধরনের প্রার্থী
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তিন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের রাজনৈতিক ও পেশাগত পরিচিতিতেও ভিন্নতা রয়েছে।
বিএনপি এমন দুজনকে সামনে আনছে, যাঁদের সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আবদুস সালাম আগে সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মহানগর দক্ষিণে দীর্ঘদিন সাংগঠনিক নেতৃত্বে ছিলেন। শফিকুল ইসলাম খানও বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় পরিচিত মুখ এবং সিটি প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জামায়াতের উত্তরের সম্ভাব্য প্রার্থী সেলিম উদ্দিন দলটির নগর সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। দক্ষিণের সম্ভাব্য প্রার্থী সাদিক কায়েমের পরিচিতি তৈরি হয়েছে মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে। ফলে নগর সংগঠন ও তরুণ প্রজন্ম—দুই ধরনের রাজনৈতিক পরিচিতিকে সামনে আনছে জামায়াত।
অন্যদিকে এনসিপি বেছে নিয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দুই পরিচিত মুখকে। ফলে তাদের প্রার্থীদের প্রচারের কেন্দ্রে নতুন রাজনৈতিক শক্তি, পরিবর্তন ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বার্তা গুরুত্ব পেতে পারে।
দলীয় প্রতীক না থাকায় ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ
নির্দলীয় পদ্ধতিতে সিটি নির্বাচন হওয়ায় ব্যালটে কোনো প্রার্থীর পাশে দলীয় প্রতীক থাকবে না। ফলে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, সাংগঠনিক সক্ষমতা, স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতের মতো বড় রাজনৈতিক সংগঠনের সমর্থন কোনো প্রার্থীর পক্ষে কতটা ভোটে রূপান্তরিত হয়, সেটিও নির্বাচনে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। এনসিপির ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক পরিচিতি ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভাবমূর্তি কতটা ভোটারদের আকৃষ্ট করে, সেটিও আলোচনার বিষয়।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন তাই শুধু মেয়র নির্বাচনের প্রতিযোগিতা নয়, তিন রাজনৈতিক শক্তির জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পরীক্ষাও হয়ে উঠতে পারে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের দলীয় সংগঠন নাকি নতুন রাজনৈতিক পরিচিতি—শেষ পর্যন্ত কোনটি ঢাকার ভোটারদের বেশি আকৃষ্ট করে, তারই প্রতিফলন দেখা যেতে পারে নির্বাচনের ফলাফলে।