ঢাকা

সৌদি ঘাঁটিতে হুতিদের হামলা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে যুবরাজের সঙ্গে মার্কিন কমান্ডারের বৈঠক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে সৌদি আরবের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিরা। সোমবার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। একই সময়ে ইয়েমেনের ভেতরে সৌদি–সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুতিদের লড়াইও তীব্র হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সোমবার জেদ্দায় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আঞ্চলিক সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে সৌদি রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স।

হুতিদের হামলা এবং ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে, যখন হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার কথা ছিল। তবে ওমানে অনুষ্ঠেয় সেই বৈঠক শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়ে গেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ—হরমুজ ও বাব আল–মানদেব—একই সময়ে উত্তেজনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে হামলার দাবি

হুতিদের দাবি, সোমবার খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, রাডার ব্যবস্থা, রানওয়ে, গোলাবারুদের গুদামসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করেছে গোষ্ঠীটি।

সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে হুতিদের এই হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

এর আগে রোববার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের খামিস মুশাইতসহ কয়েকটি শহরে অল্প সময়ের জন্য জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। ওই দিনও দক্ষিণাঞ্চলের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে হুতিরা।

গোষ্ঠীটির দাবি, গত কয়েক দিনে ইয়েমেনে তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে সৌদি বাহিনী ৩০০টির বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে সৌদি ভূখণ্ডে পাল্টা হামলা চালানো হচ্ছে বলেও জানিয়েছে তারা।

যুবরাজের সঙ্গে মার্কিন কমান্ডারের বৈঠক

হুতিদের ধারাবাহিক হামলার মধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে মার্কিন সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের বৈঠক বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জেদ্দায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে আঞ্চলিক সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সৌদি রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন জানিয়েছে।

কয়েক দিন আগে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন সৌদি যুবরাজ। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, হুতিদের ওপর সরাসরি মার্কিন হামলায় ট্রাম্প রাজি হননি। তবে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য এবং হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

এর ফলে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—সৌদি আরবকে হুতিদের হামলা মোকাবিলায় সহায়তা করতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু ইয়েমেনের সংঘাতে সরাসরি নতুন করে বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু করতে এখনো সতর্ক ট্রাম্প প্রশাসন।

ইয়েমেনে ছড়িয়ে পড়ছে সংঘাত

সৌদি আরবের সামরিক স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের ভেতরেও হুতিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘাত বেড়েছে।

আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি–সমর্থিত সরকারি বাহিনী হুতিদের কাছ থেকে কয়েকটি এলাকা পুনর্দখল করে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশের পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে। রোববার হুতিদের একটি আক্রমণ প্রতিহত করার পর সরকারি বাহিনী ওই এলাকায় অগ্রসর হয়। স্থল অভিযানের পাশাপাশি হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলাও চালানো হচ্ছে।

সংঘাত উত্তরাঞ্চলের মারিব প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। মারিব ইয়েমেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। সেখানে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে।

ফলে লড়াই আরও বিস্তৃত হলে ইয়েমেনের সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

হুতিদের দখলে আরও দুটি দ্বীপ

হুতিদের সামরিক অগ্রযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলের দুটি কৌশলগত দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ নামে দুটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুতিরা। বাব আল–মানদেব প্রণালি থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত দ্বীপ দুটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি বাহিনীর সদস্যরা সরে যাওয়ার পর হুতিরা দ্বীপ দুটির নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে হুতিরা। পরদিন শুক্রবার তারা বাব আল–মানদেবের ভেতরে অবস্থিত মাইয়ুন দ্বীপও দখলের দাবি করে।

বাব আল–মানদেব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বাব আল–মানদেব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। হরমুজ প্রণালির পর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এটি।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাব আল–মানদেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সৌদি আরবের তেলসহ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পণ্য এ পথ ব্যবহার করে এশিয়া ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে যায়।

এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হুতিদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নতুন করে বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

হরমুজ বৈঠক শেষ মুহূর্তে স্থগিত

হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিনিধিদের ওমানে বৈঠকে বসার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত বৈঠকটি শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়ে যায়।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, সৌদি আরবের অনুরোধে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। বৈঠক স্থগিতের কারণ হিসেবে ইয়েমেনের পরিস্থিতিকে দেখিয়েছে রিয়াদ। তবে বাঘাই এটিকে ‘মিথ্যা অজুহাত’ বলে মন্তব্য করেছেন।

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর আলবুসাইদি অবশ্য জানিয়েছেন, ‘ঐকমত্যের স্বার্থে’ বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে।

কাতারের হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুলতান বারাকাতের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতায় যেতে হতে পারে। তাঁর মতে, চলমান সংকটে আরব দেশগুলোকেই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।

তেলের বাজারে নতুন চাপ

ইয়েমেনে সংঘাতের বিস্তার ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সাপ্তাহিক ছুটি শেষে বাজার খোলার পর সোমবার অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

এর আগে গত শুক্রবার হুতিদের ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যায়। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় সৌদি আরবের জন্য এই পাইপলাইনের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।

ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেল উৎপাদনকেন্দ্রকে লোহিত সাগর উপকূলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা যায় এবং হরমুজ এড়িয়ে সৌদি তেল রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়।

পাইপলাইনটি কয়েক দিনের মধ্যে চালু করা না গেলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে হরমুজ ও বাব আল–মানদেব—দুটি সমুদ্রপথেই যদি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হয়, তাহলে জ্বালানি বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে।

বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট

নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েমেনে মানবিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাবে, সাম্প্রতিক সংঘাতে প্রায় ৮৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ লোহিত সাগরের পশ্চিম তীরের দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছে।

তাইজের কাছে সরকারি বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আশ্রয় নেওয়া আয়েশা মুহাম্মদ নামে এক বৃদ্ধা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে পালিয়ে আসার সময় তাঁর দুই মেয়ে ও তিন ছেলে তাঁর সঙ্গে আসতে পারেননি।

তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যরা খাবার ও পানি কিনতে বাজারেও যেতে পারছেন না। ঘরেই আটকা পড়ে আছেন তাঁরা।

ওয়াশিংটনের সামনে কঠিন হিসাব

ইয়েমেনে সংঘাত যত বাড়ছে, ততই কঠিন হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি। একদিকে সৌদি আরব দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে ওয়াশিংটনের সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা চাইছে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পাশাপাশি ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় রণাঙ্গন সামলাতে হবে।

হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। বাব আল–মানদেবের আশপাশে তাদের অবস্থান শক্তিশালী হলে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলও নতুন করে হুমকির মুখে পড়বে।

একই সময়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত হওয়ায় কূটনৈতিক সমাধানের পথও আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অধ্যাপক সুলতান বারাকাতের ভাষায়, হরমুজ নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকে শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতায় যেতে হতে পারে। আর মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত যদি একাধিক সমুদ্রপথ ও স্থলভাগে একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতে পারে আঞ্চলিক দেশগুলোকেই।

তথ্যসূত্র: এএফপি, রয়টার্স, এপি ও আল–জাজিরা

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স