ঢাকা

কিমের ‘গোপন ছেলে’ নিয়ে রহস্য, গোয়েন্দা নজরদারিতে উত্তর কোরিয়ার নেতা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের গোপন কোনো ছেলে আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (এনআইএস)। কিমের উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনার মধ্যেই তাঁর সম্ভাব্য ছেলেসন্তানের বিষয়ে তথ্য যাচাই করছে সংস্থাটি।

গত বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে এনআইএস জানিয়েছে, কিমের মেয়ে কিম জু এ–এর কোনো বড় ভাই আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে কিমের কোনো ছেলে থাকলেও সে উত্তরাধিকারী হওয়ার অবস্থানে নেই বলেও গোয়েন্দা সংস্থার সর্বশেষ মূল্যায়নে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

২০১১ সালে বাবা কিম জং ইলের মৃত্যুর পর উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতায় আসেন কিম জং–উন। প্রায় দেড় দশক ধরে দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতায় থাকা কিমের উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনা রয়েছে।

কিম জু এ–ই কি উত্তরসূরি

দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, কিম জং–উনের পর তাঁর মেয়ে কিম জু এ–এর ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাই বেশি। ধারণা করা হয়, তাঁর বয়স বর্তমানে প্রায় ১৩ বছর।

কিম জু একে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাবার সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার সামরিক শক্তি প্রদর্শন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিসংক্রান্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

এর ফলে কিম জু একে ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার সর্বশেষ মূল্যায়নও সেই সম্ভাবনাকে জোরালো করেছে।

তবে একই সঙ্গে কিমের পরিবারের অন্য সন্তানদের বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

বড় ভাই আছে কি না, নিশ্চিত নয়

এনআইএস জানিয়েছে, কিম জু এ–এর কোনো বড় ভাই আছে কি না, তা তারা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, কিমের কোনো ছেলেসন্তান থাকলেও সে হয়তো তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার অবস্থানে নেই।

কিম জং–উনের আরও একটি ছোট সন্তান রয়েছে বলেও এনআইএস জানিয়েছে। তবে শিশুটি ছেলে নাকি মেয়ে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

কিমের সম্ভাব্য ছেলেসন্তান নিয়ে এর আগেও আলোচনা হয়েছে। ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার এক আইনপ্রণেতা জানিয়েছিলেন, সংসদীয় কমিটিকে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে এনআইএস কিম জু এ–এর একজন বড় ভাই থাকার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল।

তবে পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা সংস্থাটি স্পষ্ট করে, কিমের ছেলে রয়েছে—এমন প্রতিবেদন তারা তখনো যাচাই করে দেখছিল। ফলে কিমের সম্ভাব্য ছেলেসন্তান নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা মহলেও এখনো পূর্ণ নিশ্চয়তা নেই।

ছেলে থাকলে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

কিম জং–উনের কোনো ছেলে আছে কি না, সেটি নিছক পারিবারিক তথ্য নয়; উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নের সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি জড়িত।

১৯৪৮ সালে উত্তর কোরিয়া প্রতিষ্ঠার পর দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ছিলেন কিম পরিবারের তিনজন পুরুষ—কিম ইল–সুং, কিম জং–ইল এবং কিম জং–উন। ফলে দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পুরুষতান্ত্রিক উত্তরাধিকারব্যবস্থার একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে।

এই বাস্তবতায় কিম জু এ যদি শেষ পর্যন্ত বাবার উত্তরসূরি হন, সেটি হবে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তন।

কিম পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্যকে বাদ দিয়ে একজন নারী সর্বোচ্চ নেতা হলে দেশটির শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারা বিষয়টি কীভাবে গ্রহণ করবেন, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।

কিম জু একে নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সংশয়

কিম জু একে উত্তরসূরি হিসেবে সামনে আনার সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে পুরোপুরি ঐকমত্য নেই। তাঁদের একটি অংশ মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার মতো গভীরভাবে পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একজন নারীকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে গ্রহণ করা সহজ নাও হতে পারে।

বিশেষ করে দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক অভিজাতদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে পুরুষ নেতৃত্বের অধীনে কাজ করে আসছে। ফলে কিম জু একে ঘিরে বর্তমান প্রতীকী উপস্থিতি ভবিষ্যতে সরাসরি ক্ষমতা হস্তান্তরে পরিণত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

এ কারণে কিমের সম্ভাব্য ছেলেসন্তানের বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। যদি তাঁর কোনো ছেলে থাকে এবং ভবিষ্যতে তাকে উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়, তাহলে কিম পরিবারের পুরুষ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।

উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা

কিম জং–উনের উত্তরাধিকার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তাঁর সন্তানদের বয়স কম হওয়ায়। কিম জু এ এখনো কিশোরী। ফলে কিমের আকস্মিক মৃত্যু বা নেতৃত্বে অক্ষমতা তৈরি হলে ক্ষমতা কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও বড় অনিশ্চয়তা।

অন্যদিকে কিমের ছোট সন্তান ছেলে না মেয়ে—এ তথ্যও প্রকাশ্যে নিশ্চিত নয়। সম্ভাব্য বড় ভাইয়ের অস্তিত্ব নিয়েও দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দারা এখনো অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

ফলে উত্তর কোরিয়ার পরবর্তী নেতা হিসেবে কিম জু এ–এর নাম ক্রমেই সামনে এলেও তাঁর উত্তরাধিকার এখনো চূড়ান্ত নয়।

কিম পরিবারের ক্ষমতা কি টিকে থাকবে

কিম জু এ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় এলেও দীর্ঘ মেয়াদে কিম পরিবারের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব টিকে থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের একটি উদ্বেগ হলো, কিম জু এ যদি ভবিষ্যতে বিয়ে করেন এবং তাঁর সন্তান পরবর্তী সময়ে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা হন, তাহলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যে দেশটির ক্ষমতা কিম পরিবারের সরাসরি রক্তধারা থেকে অন্য একটি পরিবারের হাতে চলে যেতে পারে।

অর্থাৎ, উত্তরাধিকার প্রশ্নটি শুধু কিমের ছেলে নাকি মেয়ে—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উত্তর কোরিয়ার প্রায় আট দশকের কিম পরিবারকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।

এই কারণেই কিমের গোপন কোনো ছেলে আছে কি না, কিম জু এ সত্যিই উত্তরসূরি হচ্ছেন কি না এবং শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতা কিম পরিবারের মধ্যেই থাকবে কি না—এসব প্রশ্ন এখন দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স