ঢাকা

ইরানের স্কুলে হামলা নিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি ক্রীড়া স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার ঘটনায় যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হওয়ার ‘যুক্তিসংগত ভিত্তি’ রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের স্বাধীন তথ্য অনুসন্ধানী মিশন। মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের দুটি বেসামরিক স্থাপনায় চালানো হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করেছে।

জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট–ফাইন্ডিং মিশন অন ইরান বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানায়। প্রতিবেদনটি জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে উপস্থাপনের কথা রয়েছে। মিশনের তদন্তে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং লামার্দ শহরের একটি ক্রীড়া স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়ে আলাদা করে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিনাবের স্কুলে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী জড়িত থাকার বিষয়ে যুক্তিসংগত ভিত্তি পাওয়া গেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের হিসাবে, হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে প্রায় ১২০ জন শিশু ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের মিশন স্কুলটিকে সুস্পষ্টভাবে বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং সেটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল—এমন কোনো তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়নি।

মিনাবের স্কুলে কী ঘটেছিল

হামলাটি ঘটে ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরান যুদ্ধ শুরুর দিন। মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়টি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। জাতিসংঘের অনুসন্ধান অনুযায়ী, স্কুলটি ছিল একটি চিহ্নিত বেসামরিক স্থাপনা এবং সেখানে সামরিক কার্যক্রম চলছিল—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাটি শুধু কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি গিয়ে পড়া বিস্ফোরণ বা অনিচ্ছাকৃত ক্ষয়ক্ষতি ছিল—এমন ব্যাখ্যার সঙ্গে তদন্তের ফল মেলে না। বরং স্কুল ভবনটিকেই হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করার যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে বলে মিশন মনে করছে।

ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় নিহতের সংখ্যা ১৫০ ছাড়িয়ে যায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে; তবে শিশুদের বড় একটি অংশ নিহত হওয়ার বিষয়ে একাধিক সূত্রে একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্রায় ১২০ শিশুর নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের তদন্তে আরও বলা হয়েছে, হামলার আগে লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে যথেষ্ট যাচাই করা হয়নি। ফলে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সামরিক ঘাঁটির পাশে ছিল স্কুল

প্রাথমিক তদন্তের বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, মিনাবের ওই স্কুল ভবনটি একটি ইরানি সামরিক স্থাপনার কাছাকাছি ছিল। আগে ভবনটি সামরিক ঘাঁটির অংশ ছিল বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। তবে হামলার সময় ভবনটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল—এমন প্রমাণ জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দল পায়নি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী ওই এলাকায় একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সামরিক কমান্ডার অবস্থান করছেন—এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হামলার পরিকল্পনা করেছিল বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। কিন্তু লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কিত তথ্য হালনাগাদ করা হয়েছিল কি না এবং হামলার আগে ভবনটির প্রকৃতি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

জাতিসংঘের মিশনের মতে, লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে পর্যাপ্ত যাচাই না করে হামলা চালানোর বিষয়টি কেবল সাধারণ অবহেলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে সামরিক বাহিনীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

টমাহক হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ তদন্ত

মিনাবের স্কুলে হামলার দায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আগে স্পষ্ট স্বীকারোক্তি আসেনি। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দায়ী ছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

হামলার লক্ষ্য ছিল স্কুলের পাশের একটি ইরানি সামরিক ঘাঁটি—এমন তথ্যও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোতে উঠে এসেছে। লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরোনো গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কর্মকর্তারা ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন বলে তদন্ত সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

এর ফলে বেসামরিক স্থাপনা শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জাতিসংঘের মিশনের সিদ্ধান্তও মূলত হামলার ধরন, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং বেসামরিক স্থাপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বিধান অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে।

লামার্দের ক্রীড়া স্থাপনাতেও হামলা

শুধু মিনাবের স্কুল নয়, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় লামার্দ শহরের একটি ক্রীড়া স্থাপনায় চালানো হামলার ঘটনাও তদন্ত করেছে জাতিসংঘের মিশন।

তদন্তকারীদের মতে, ওই স্থাপনাটি এবং আশপাশের আবাসিক এলাকা বেসামরিক হিসেবে শনাক্তযোগ্য ছিল। হামলায় ক্রীড়া স্থাপনার পাশাপাশি আশপাশের আবাসিক ভবন ও একটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে অন্তত ২২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত বা আহত হন।

মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় এমন ধরনের বিস্ফোরক বা অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছিল, যার ধাতব টুকরো আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বেসামরিক স্থাপনা ও আবাসিক এলাকার উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে হামলাটিকে নির্বিচার হামলা হিসেবে দেখার যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে বলে তদন্তকারীরা মনে করেছেন।

দুটি হামলার ঘটনাতেই জাতিসংঘের অনুসন্ধানী মিশন বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বিধান যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের আইনি তাৎপর্য

জাতিসংঘের তথ্য অনুসন্ধানী মিশন কোনো আদালত নয় এবং তাদের প্রতিবেদন সরাসরি কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে না। তবে এ ধরনের তদন্তে সংগৃহীত তথ্য ভবিষ্যতে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আইনি প্রক্রিয়ায় প্রাসঙ্গিক হতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিশন নিজে কোনো ফৌজদারি বিচার বা মামলা পরিচালনা করতে পারে না।

এ ক্ষেত্রে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনকে বোঝানো হচ্ছে। সশস্ত্র সংঘাতের সময় বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক স্থাপনা সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আইনে যে বিধান রয়েছে, সেগুলোই হামলার বৈধতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

মিনাব ও লামার্দের হামলার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মিশন বিশেষভাবে হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ, বেসামরিক স্থাপনা শনাক্ত করা এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে সেগুলোর পার্থক্য নিশ্চিত করার বিষয়টি পর্যালোচনা করেছে।

যুদ্ধের প্রথম দিনেই বড় বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে চলমান যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর ইরান পাল্টা হামলা চালায় এবং সংঘাতটি দ্রুত আঞ্চলিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।

এই বৃহত্তর সংঘাতের মধ্যেই মিনাবের স্কুল ও লামার্দের ক্রীড়া স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদন সেই হামলাগুলোর নির্দিষ্ট বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের প্রশ্ন সামনে এনেছে।

মিনাবের হামলায় বিপুলসংখ্যক শিশু নিহত হওয়ার তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। জাতিসংঘের মিশনের অনুসন্ধান অনুযায়ী, স্কুলটিতে সামরিক ব্যবহারের প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও সেখানে হামলা চালানো হয়েছিল এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাইয়ের ঘাটতি ছিল।

ফলে ইরানে যুদ্ধের প্রথম দিনেই সংঘটিত এই দুই হামলা এখন আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে প্রতিবেদনটি উপস্থাপনের পর এ বিষয়ে আরও আলোচনা ও পরবর্তী পদক্ষেপের সুযোগ তৈরি হবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স