ঢাকা

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেন বাংলাদেশি গবেষক রঞ্জন দত্ত, কানাডার রয়্যাল সোসাইটির স্কলার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
কানাডার রয়্যাল সোসাইটি অব কানাডার (আরএসসি) কলেজ অব নিউ স্কলার্স, আর্টিস্টস অ্যান্ড সায়েন্টিস্টসের ২০২৬ সালের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত গবেষক রঞ্জন দত্ত। তিনি কানাডার মাউন্ট রয়্যাল ইউনিভার্সিটির ইন্ডিজেনাস স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। ২০২০ সাল থেকে তিনি কমিউনিটি ডিজাস্টার রিসার্চে কানাডা রিসার্চ চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় ও আদিবাসী জ্ঞান, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কমিউনিটিভিত্তিক গবেষণায় দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি কানাডার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের কলেজ অব নিউ স্কলার্সের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

রয়্যাল সোসাইটি অব কানাডা ২০২৬ সালের নতুন ফেলো ও কলেজ সদস্যদের তালিকা প্রকাশ করেছে। এ বছর কলেজ অব নিউ স্কলার্স, আর্টিস্টস অ্যান্ড সায়েন্টিস্টসে ৫৪ জন এবং রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হিসেবে ১০৫ জন নির্বাচিত হয়েছেন। কানাডার মধ্যম পর্যায়ের গবেষকদের জন্য কলেজ অব নিউ স্কলার্সের সদস্যপদ একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

গবেষণায় কমিউনিটির জ্ঞানকে গুরুত্ব

রঞ্জন দত্ত গত ১৭ বছর ধরে আদিবাসী, স্থানীয় ও বিভিন্ন অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলা নিয়ে কমিউনিটিভিত্তিক গবেষণা করছেন। তাঁর গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা।

তাঁর নেতৃত্বে ও যৌথ নেতৃত্বে পরিচালিত ৩৯টি গবেষণা প্রকল্পে ১৫ মিলিয়ন কানাডীয় ডলারের বেশি প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা তহবিল সংগ্রহ হয়েছে। কানাডার বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও আর্কটিক অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর গবেষণা অংশীদারত্ব রয়েছে।

বাংলাদেশ ও নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এবং কানাডার বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। এসব গবেষণায় দুর্যোগ ঝুঁকি, পরিবেশগত পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তা, মানুষের কল্যাণ এবং স্থানীয় শাসনব্যবস্থার মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

রঞ্জন দত্তের গবেষণার একটি বড় দিক হলো—বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং কমিউনিটির নিজস্ব জ্ঞানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা। তাঁর গবেষণা অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোনো অঞ্চলে উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণা চললেও একই সময়ে সেই অঞ্চলের মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত স্থানীয় ও ভূমিনির্ভর জ্ঞান থাকতে পারে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই দুই ধরনের জ্ঞানের মধ্যে পর্যাপ্ত যোগাযোগ তৈরি হয় না।

এই ব্যবধান কমিয়ে গবেষণায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বিশেষ করে কোনো গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণ, গবেষণার ফলাফল ব্যাখ্যা এবং জনগোষ্ঠীর ভূমি, পানি ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে—এমন নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

দুর্যোগ ও দাবানল মোকাবিলায় গবেষণা

দুর্যোগ ও দাবানল মোকাবিলাও রঞ্জন দত্তের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কানাডার উত্তর সাসকাচোয়ানের উডল্যান্ড ক্রি ফার্স্ট নেশন সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরিচালিত তাঁর গবেষণায় স্থানীয় প্রবীণদের জ্ঞান এবং ভূমিনির্ভর অভিজ্ঞতাকে দাবানলের ঝুঁকি মোকাবিলা, বন ব্যবস্থাপনা ও জরুরি পরিকল্পনায় কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা গুরুত্ব পেয়েছে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অনেক সময় কোনো এলাকার পরিবেশ, ভূমি, পানি ও প্রাকৃতিক পরিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। রঞ্জন দত্তের গবেষণায় সেই জ্ঞানকে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কানাডার সাসকাচোয়ান, আলবার্টা ও আর্কটিক অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাংলাদেশ ও নেপালের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর গবেষণার পরিধিকে বিস্তৃত করেছে।

নীতিনির্ধারণেও গবেষণার প্রভাব

মাউন্ট রয়্যাল ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে রঞ্জন দত্তের গবেষণা সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নীতিগত আলোচনাতেও প্রভাব ফেলেছে। কানাডায় তিনি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পানির অধিকার এবং স্থানীয় শাসনব্যবস্থা নিয়েও কাজ করছেন।

তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্যগুলোর একটি হলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জ্ঞান, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং ভূমিভিত্তিক অভিজ্ঞতাকে গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে বিবেচনায় আনা। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, পরিবেশগত পরিবর্তন, দুর্যোগ এবং মানুষের কল্যাণের মতো জটিল বিষয় মোকাবিলায় এসব জ্ঞান কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়েও তিনি কাজ করছেন।

রঞ্জন দত্তের মতে, স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিজস্ব জ্ঞান ও কাজের পদ্ধতি ব্যবহার করে নানা ধরনের সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলা করে আসছে। এসব জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে গবেষণার ফলাফল যেমন আরও বাস্তবভিত্তিক হতে পারে, তেমনি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের সঙ্গে নীতিনির্ধারণেরও বেশি সামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।

রয়্যাল সোসাইটির অভিনন্দন

রঞ্জন দত্তের নির্বাচনে অভিনন্দন জানিয়েছেন মাউন্ট রয়্যাল ইউনিভার্সিটির প্রভোস্ট ও একাডেমিকবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট চ্যাড লন্ডন। তিনি বলেন, রয়্যাল সোসাইটি অব কানাডায় রঞ্জন দত্তের নির্বাচিত হওয়া তাঁর গবেষণার প্রভাব এবং কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে গবেষণা পরিচালনার প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের স্বীকৃতি।

চ্যাড লন্ডনের ভাষ্য অনুযায়ী, রঞ্জন দত্ত যেসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করেন, তাঁদের সম্পর্ক, জ্ঞান ও অগ্রাধিকারকে তিনি গবেষণার কেন্দ্রে রাখেন। তাঁর নির্বাচিত হওয়া রঞ্জন দত্তের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ সম্মান, তেমনি মাউন্ট রয়্যাল ইউনিভার্সিটির জন্যও এটি একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণার শক্তি, ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং বিভিন্ন কমিউনিটিতে সেই গবেষণার প্রভাবের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে।

রয়্যাল সোসাইটি অব কানাডার সভাপতি ফ্রাঁসোয়াজ বেলিসও নতুন ফেলো ও কলেজ সদস্যদের স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন সদস্যদের কাজ চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও জলবায়ু গবেষণায় সাফল্য, শিল্পকলা ও সাহিত্যে অবদান, নেতৃত্ব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রচেষ্টাসহ বিস্তৃত ক্ষেত্রজুড়ে বিস্তৃত। তাঁদের পাণ্ডিত্য ও সৃজনশীলতা কানাডার সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ

রয়্যাল সোসাইটি অব কানাডার নতুন ফেলো ও কলেজ সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করা হবে আগামী নভেম্বরে কানাডার রাজধানী অটোয়ায়।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত গবেষক রঞ্জন দত্তের এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও কমিউনিটিভিত্তিক গবেষণায় তাঁর দীর্ঘদিনের কাজ আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে আরও স্বীকৃতি পেল। বিশেষ করে স্থানীয় ও আদিবাসী জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করার যে গবেষণাধারা তিনি এগিয়ে নিচ্ছেন, এই স্বীকৃতি সেই কাজেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স